
বিপ্লব রায়।।
ব্রিটিশ ভারতে গোঁড়া মুসলিম পরিবারে জন্ম হয়েছিল বিসমিল্লাহ খাঁনের। জন্মের পর নামও রাখা হয়েছিল ঠিক সেভাবেই। ‘কামরুদ্দিন খাঁন’। কিন্তু কী হবে! সেই নাম বেশিক্ষণ ধোপে টেকেনি। কারণ ১৯১৬ সালের ২১ মার্চ জন্মের পর তাঁর সানাইবাদক ঠাকুরদা বলে ফেলেন, ‘‘বিসমিল্লাহ !’’ অর্থাৎ, আল্লাহর নামেই কামরুদ্দিনের নাম হবে। সেই থেকে গুণী এই মানুষটির নাম হয়ে গেল বিসমিল্লাহ খাঁন। কিন্তু তাতে কী! বিধাতা যে তাঁর কাছেই দিয়ে দিয়েছেন সানাইয়ে অমৃত সুর। ভারতের ইতিহাসে যে সুর কেউ কখনো বাজাতে পারেনি। বিসমিল্লাহ খাঁন আল্লাহ্ কে বিশ্বাস করতেন প্রাণ দিয়ে। নামাজ আদায় করতে পাঁচ ওয়াক্ত।
গঙ্গাস্নান করতেন রোজ সকালে। সন্ধ্যায় রোজ বালাজি মন্দিরের চাতালে গিয়ে সাধনা করতেন সুরের। বিসমিল্লাহ খাঁন সব সময় বসেই সানাইয়ের সুর তুলতেন। কখনও দাঁড়িয়ে সানাই বাজাতেন না। বছরে শুধু মহরমের এক দিন দিন তিনি রাস্তায় বেরিয়ে কোনও রাগ বাজাতেন না, বাজাতেন বিলাতগীতি নৌহা |
প্রতিটি অনুষ্ঠানে ‘রঘুপতি রাঘব’ অবধারিত ছিল। রাধাকৃষ্ণের লীলা পরিবেশন করতে করতে তিনি সব সময় বলতেন, ‘ এই সুরে সানাইয়ে সুর তুলতে গিয়ে মনটা আমার বৃন্দাবনে চলে যায়।’
শৈশবের কথা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে গুণী এই মানুষটি বলতেন, ‘প্রতিদিন ভোরবেলা গঙ্গায় স্নান করে মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তাম। তারপর বালাজি মন্দিরে গিয়ে সারাদিন সানাই বাজাতাম। কই, কোনোদিন তো অসুবিধা হয়নি।’
মাত্র ৬ বছর বয়সে বারাণসীতে মামা বাড়ি চলে গিয়েছিলেন ‘বিসমিল্লাহ’। মামা আলি বক্স ‘বিলায়েতু’ খান ছিলেন কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের সানাইবাদক। তাঁর কাছেই সানাইয়ের হাতেখড়ি হয় বিসমিল্লাহ খানের। যেই শেখা শুরু, এরপর আর তাঁকে ঠেকায় কে! পরে মাত্র ১৪ বছর বয়সে মামার সঙ্গে ‘ইলাহাবাদ মিউজিক কনফারেন্স’-এ গিয়ে সবাইকে অবাক করে দেন কিশোর সানাইবাদক বিসমিল্লাহ খান।
ভারতের স্বাধীনতার পর প্রথম প্রজাতন্ত্র দিবসের পদযাত্রায় সানাই বাজানোর জন্য বিসমিল্লাহ খাঁনকে ব্যক্তিগতভাবে অনুরোধ করলেন জওহরলাল নেহেরু। কিন্তু কিশোর বয়সেই তারকা খ্যাতি পেয়ে প্রথমেই সেই প্রস্তাব নাকচ করে দিলেন তিনি।’ জওহরলাল নেহেরুকে বিসমিল্লাহ বলে দিলেন- একমাত্র মহরমের দিন ছাড়া আমি দাঁড়িয়ে সানাই বাজাই না।’
তবে নেহেরুও রেগে না গিয়ে ভারতের স্বাধীনতার পর প্রথম প্রজাতন্ত্র দিবসের গুরুত্ব বুঝিয়ে আবার অনুরোধ করায় রাজি হলেন। খাঁ সাহেব ভাবনায় পড়লেন, কী বাজানো যায় ! হঠাৎ বেনারসের ঘাটে মাঝিদের গানের সুর কানে এল। সঙ্গে সঙ্গে ঠিক করে সেদিন বাজালেন ‘গঙ্গা দুয়ারে বানাইয়া বাজে’।
সানাইয়ের সুরে সেদিন দেশবাসীর কাছে দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষের মেঠো সুর পৌঁছে দিতে চেয়েছিলেন তিনি। ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি দিল্লির লাল কেল্লায় অনুষ্ঠিত ভারতের প্রথম প্রজাতন্ত্র দিবসে বিসমিল্লাহ খান সাহেব তার অন্তরের মাধুরী ঢেলে রাগ কাফি বাজিয়ে মুগ্ধ করেছিলেন সারা ভারতবর্ষকে। এরকম বহু অনুষ্ঠানে তিনি হাজারো মানুষকে সানাইয়ের সুরে সম্মোহিত করেছেন। ধীরে ধীরে সানাই আর বিসমিল্লাহ খাঁন হয়ে উঠেছিলেন একে অন্যের পরিপূরক। ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান ছিলেন একজন ধার্মিক সুন্নি মুসলমান। তাঁর সঙ্গীত গুরু ছিলেন প্রয়াত আলী বকস্ বিলায়াতু। তিনি ছিলেন বারাণসীর বিশ্বনাথ মন্দিরের সানাই বাদক।
আরো পড়তে পারেন- কাহলিল জিবরানের ১০ উক্তি, বদলে যাবে জীবন
২০০৬ সালের ২১ মার্চ ৯০ বছর বয়সে ইহজগতের মায়া ত্যাগ করেন বিসমিল্লাহ্ খান। তাঁর মহাপ্রয়াণে একদিন জাতীয় শোক ঘোষণা করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। মৃত্যুর পর ভারতীয় সেনা ২১ বার তোপধ্বনিতে বিদায় জানিয়েছিল বৃদ্ধ সানাইবাদককে। পরে তাঁর দেহ সমাধিস্থ করা হয়েছিল বারাণসীর ফতেহমান গোরস্থানে। বিসমিল্লাহ খাঁনের সঙ্গে মাটি দেওয়া হয়েছিল তাঁর প্রিয় একটি সানাইকেও।
তথ্য : আনন্দবাজার পত্রিকা, গৌতম ঘোষের স্মৃতিচারণ ও উইকিপিডিয়া বাংলা

Pingback: বাউল কে, কীভাবে বাউল হওয়া যায়! – বানী বিতান – Bani Bitan – আঁধার ভেঙে আলোর পথে