কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য: এক মাটির মানুষের গল্প

কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য
কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য

বিপ্লব রায়।।
কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য। বাঙলা লোকসংগীতের একাধারে একজন অন্যতম গবেষক ও শিল্পী। যাঁর নামের সঙ্গেই যুক্ত ছিল মাটি ও মানুষের গন্ধ। যাঁকে সবাই কালীকা দা বলেই ডাকতেন। কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য আসামের বাসিন্দা হলেও তাঁর আদি নিবাস ছিল সিলেট অঞ্চলে। তাই বার বার ছুটে আসতেন এই অঞ্চলে। তাই নাড়ির টানেই কালিকা প্রসাদ বার বার ছুটে আসতেন এই বাংলায়। মরমী বাউল শাহ আবদুল করিমের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য।

কালিকা ভট্টাচার্যের শুধু সুর নয়, কথা বললেই মুগ্ধ হতো মানুষের প্রাণ। ওপার বাঙলায় প্রতিষ্ঠিত দোহার ব্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য। ১৯৯৯ সালে উত্তরবঙ্গ এবং পূর্ববঙ্গের পল্লীগান ও লোকায়ত গানের ঐতিহ্যকে পুনর্জাগরণের উদ্দেশ্যে কয়েকজন বন্ধু গায়ক-যন্ত্রী নিয়ে কলকাতায় লোকগানের এই ব্যান্ডদল প্রতিষ্ঠা করে গেছেন তিনি। যে ব্যান্ডদলের পোশাক, বাদ্য ও গানের যে সৌন্দর্য রয়েছে, তা অন্য ক্ষেত্রে দেখা যায় না।

— কোন মিস্তিরি নাও বানাইলো
এমন দেখা যায়,
ঝিলমিল ঝিলমিল করে রে,
ময়ুর পঙ্খী নাও।

কিংবা “তোমায় হৃদ মাঝারে রাখবো, ছেড়ে দেব না।” রবীন্দ্রনাথের এই বাউল অংগের গানগুলো যেন দোহার ব্যান্ডদলের স্পর্শে অন্যরকম প্রাণ পেয়েছিল। যাঁর নেপথ্যে ছিলেন কালিকা প্রসাদ। বিহু, বাউল, কামরুপি, ভাওয়াইয়ার মতো কত গান যে তিনি গেয়ে মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছিলেন, তার কোনো হিসেব নেই। মূল কথা হচ্ছে- কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য মুখে ও মনে একই চিন্তা ধারণ করতেন। যা বলতেন, করতেনও ঠিক সেরকমই।

আসামের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্য নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন মাটির মানুষ কালিকা প্রসাদ। সঙ্গীতের অনুপ্রেরণা ছিলেন তাঁর কাকা অনন্ত ভট্টাচার্য। কাকা অনন্ত ভট্টাচার্যর বাড়িতে বসেই সংগীতে হাতেখড়ি হয় তাঁর। কারণ অনন্ত ভট্টাচার্যও ছিলেন লোক গ্রানের সংগ্রাহক। বিশাল সংগ্রহ ছিল তাঁর। তাই কাকার মৃত্যুর পর সেই সংগ্রহ নিয়েই কাজ শুরু করেন সন্তানতুল্য কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য।

কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য যখন লোকসংগীতের বিভিন্ন ধারা ও রচনা নিয়ে কথা বলতেন, তখন ভক্তরা মধুর মতো তা আত্মস্থ করতেন। কথায় কথায় কন্ঠে তুলতেন সুর- আগে কী সুন্দর দিন কাটাইতাম বা জাত গেল জাত গেল বলে, একী আজব কারখানা। খুবই সদালাপি মানুষ ছিলেন কালিকা প্রসাদ। সবার সঙ্গেই কথা বলতেন খুব আন্তরিকতার সঙ্গে। হাসিমুখে। খুব কঠিন কথাকেও খুব সহজভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার এক অসীম শক্তি ছিল তাঁর। আর তাইতো নিজগুণেই সবার মনের গভীরে কখন যে গেঁথে গিয়েছিলেন, তা তিনি হয়ত নিজেও জানতেন না।

১৯৭০ সালে ১১ সেপ্টেম্বর আসামের শিলচরে জন্মেছিলেন কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্য। তাদের ভট্টাচার্য বাড়িই ছিল তাঁর সঙ্গীত জীবনের প্রাথমিক অংশ। ছোটবেলা থেকেই বেড়ে উঠেছেন তাল এবং সুরের মধ্যে।

২০১৭ সালের ৭ মার্চে হুগলী জেলার গুরাপ গ্রামের কাছে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করেন বরেণ্য এই শিল্পী কালিকা প্রসাদ ভট্টচার্য। সেদিন তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, বাংলাদেশের ভক্ত অনুরাগীদের মধ্যে নেমে আসে শোকের ছায়া। মূলধারার সব গণমাধ্যমেও প্রচার করা হয় কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্যের অকাল প্রয়াণের খবর। আর এই খবর শুনে শোকে মূহ্যমান হয়ে পড়েন ভক্ত অনুরাগীরা।
তাঁর অকাল প্রয়াণের ঠিক চারদিন আগে প্রকাশ পায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর নির্মিত “ভুবন মাঝি”চলচ্চিত্রটি। এই চলচ্চিত্রেই তিনি জীবনে প্রথম বারের মতো সংগীত পরিচালকের গুরু দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু চোখে দেখে যেতে পারলেন না তিনি।

আজ হয়তো সশরীরে নেই। কিন্তু দুই বাংলার মানুষের হৃদয়ে কালিকা প্রসাদ ভট্টাচার্যের গান আজও গাইছে। গভীর শ্রদ্ধা গুণী এই মানুষটির প্রতি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top