
বিপ্লব রায়।।
বাউলা কে বানাইলো রে?
হাসন রাজারে বাউলা কে বানাইলো রে?
ও বাউলা কে বানাইলো রে?
হাসন রাজারে বাউলা কে বানাইলো রে…..!
মরমী এমন গান শোনেননি, এমন মানুষ খুব বেশি হয়তো মিলবে না। তরুণ প্রজন্মের অনেকেও এই গান গেয়ে মঞ্চ মাতিয়ে থাকেন। কিন্তু এই গানের মর্ম সবাই বোঝেন না। কারণ এই গানের মধ্যে রয়েছে এক অসীম দর্শন। আধ্যাত্মিক টান। গভীর অনুভব। যা বাউল না হলে সহজ মনে বোঝা কঠিন। অসম্ভব।
যুগ যুগ ধরে বাউল শব্দটির সঙ্গে আমরা পরিচিত। কিন্তু অনেকেই জানি না, বাউল আসলে কে বা কারা? কীভাবে বাউল হওয়া যায়। আজকে এ বিষয়ে আমাদের আলোচনা।
সাধারণত বাঙালি লোকাচার সঙ্গীত পরিবেশক, বাংলার সুফিবাদ ও দেহতত্ত্ব প্রভৃতি মতাদর্শ প্রচার করে যাঁরা সংগীত পরিবেশন করেন, তাদেরকে বাউল বলা হয়।
বাউলরা কোন মসজিদ- মন্দিরে যান না। বর্ণবৈষম্য বা জাতিভেদ কখনো বিশ্বাস করেন না তারা। বাউলরা বিশ্বাস করেন, পৃথিবীর সবাই মানুষ। এক ও অভিন্ন। কোন ধর্ম মানুষকে ভিন্ন করতে পারে না। গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা নিয়েই বাউল হতে হয়। বাউল সাধনা মূলত নারী-পুরুষের যুগলসাধনা। তবে জ্ঞানমার্গীয় একক যোগসাধনাও আছে তাদের মধ্যে।
বাউল শব্দের অর্থ “বায়ু”। গবেষকদের মতে, সংস্কৃত “বায়ু” থেকে বাউল শব্দটির উৎপত্তি। যেসব মানুষ “বায়ু” অর্থাৎ শ্বাস-প্রশ্বাস ক্রিয়ার সাহায্যে সাধনার মাধ্যমে আত্মিক শক্তি লাভ করার চেষ্টা করেন, তাদেরকেই বাউল বলা হয়।
যদিও এ শব্দ নিয়ে ভিন্ন মতও আছে অনেকের। কেউ কেউ বলেছেন, সংস্কৃত “বাতুল” শব্দ থেকে বাউল শব্দটির উৎপত্তি। তাদের মতে- যে সব লোক প্রকৃতই পাগল, তাই তারা কোনো সামাজিক বা ধর্মের কোনো বিধিনিষেধ মানে না, তারাই বাউল। আবার অনেকে বলেছেন “বাউর” শব্দ থেকে বাউলের উৎপত্তি, এর অর্থ এলো-মেলো, বিশৃঙ্খল বা পাগল।
আহমদ শরীফ তার “বাউলতত্ত্ব” গ্রন্থে বলেছেন, “ব্রাহ্মণ্য, শৈব ও বৌদ্ধ সহজিয়া মতের সমবায়ে গড়ে উঠেছে একটি মিশ্রমত যার নাম নাথপন্থ। দেহতাত্ত্বিক সাধনাই এদের লক্ষ্য। তাই এই তত্ত্বে হিন্দু গুরুর মুসলিম শিষ্য বা মুসলিম গুরুর হিন্দু শিষ্য গ্রহণে কোন বাধা নেই। তারা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম ও শরিয়তী ইসলামের বেড়া ভেঙে নিজের মনের মত করে পথ তৈরি করে নিয়েছেন। এজন্য তারা বলে, “কালী কৃষ্ণ গড খোদা কোন নামে নাহি বাধা। মন কালী কৃষ্ণ গড খোদা বলো রে।
আনুমানিক সপ্তদশ শতক থেকে বাউল নামের ব্যবহার ছিল বলে জানা যায়। চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থের আদিলীলা অংশেও এই শব্দের ব্যবহার লক্ষ করা করা যায়। চৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থে মহাপ্রভু, রামানন্দ রায় ও সনাতন গোস্বামীর কাছে কৃষ্ণ বিরহ বিধুর নিজেকে মহাবাউল হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। সেই থেকে অনুমান করা হয়,বাউল শব্দের উৎপত্তির কথা। বাউলের রয়েছে নানাবিধ শাখাপ্রশাখা, একেক সম্প্রদায়ের বাউলেরা একেক মত অনুসারী, সেগুলো তাদের সম্প্রদায়ভেদে ধর্মীয় উপাসনার একটি অংশ।
গৃহত্যাগী বাউল:
বাউলদের মধ্যে দুটি ভাগ রয়েছে। গৃহত্যাগী বাউল ও সংসারী বাউল। যারা গুরুর নিকট দীক্ষা নিয়ে গৃহত্যাগ করেন, তাদেরকে ত্যাগী বা ভেকধারী বাউল বলা হয়। এই শ্রেণির বাউলরা পুরোপুরি সংসার ও সমাজ বিমুখ। তারা রোজ নির্দিষ্ট সংখ্যক বাড়িতে ভিক্ষা করে অতি সাধারণ জীবনধারণ করেন। তারা বিভিন্ন আখড়ায় ঘুরে বেড়ান এবং সেখানে সাময়িকভাবে অবস্থান করেন।
পুরুষ বাউলরা সাধারণত সাদা লুঙ্গি এবং সাদা আলখাল্লা এবং মহিলারা সাদা শাড়ি পরেন। তাদের কাঁধে থাকে ভিক্ষার ঝুলি। তারা সন্তান ধারণ বা প্রতিপালন করতে পারে না। নারী বাউলদের বলা হয় সেবাদাসী। একজন পুরুষ বাউল এক বা একাধিক সেবাদাসী রাখতে পারেন। এই সেবাদাসীরা বাউলদের সাধনসঙ্গিনী। ১৯৭৬ সাল অবধি বৃহত্তর কুষ্টিয়া জেলায় ২৫২ জন ভেকধারী বাউল ছিলেন। ১৯৮২-৮৩ সালে এই সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৯০৫ জনে দাঁড়ায়। বর্তমানে সারাদেশে ভেকধারী বা গৃহত্যাগী বাউলের সংখ্যা প্রায় পাঁচ হাজার।
কামরুদ্দিন থেকে সানাই জাদুকর বিসমিল্লাহ খাঁন’
যেসব এলাকায় বাউলদের বেশি বিচরণ-
কুষ্টিয়া ও পাবনা এলাকা থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের বীরভূম-বোলপুর-জয়দেবকেন্দুলি পর্যন্ত বাউলদের বিচরণ রয়েছে। বাউলদের মধ্যে গৃহী ও সন্ন্যাসী দুই প্রকারই রয়েছে। তারা তাদের গুরুর আখড়ায় সাধনা করেন। প্রতি বৎসর পৌষ সংক্রান্তির দিন বীরভূমের জয়দেব-কেন্দুলিতে বাউলদের একটি মেলা শুরু হয়, যা “জয়দেব বাউলমেলা” নামে বিখ্যাত।
বাউলরা যে দর্শনে বিশ্বাস করেন-
বাউলেরা সাধারণত উদার ও অসাম্প্রদায়িক হয়ে থাকেন। তাঁরা মহান স্রষ্টাকে আত্মার মাধ্যমে অনুভব করেন। গানে গানে প্রকাশ করেন মানবতার বাণী। বাউল মতে বৈষ্ণবধর্ম এবং সূফীবাদের প্রভাব লক্ষ করা যায়। বাউলরা সবচেয়ে গুরুত্ব দেন আত্মাকে। বাউলরা বিশ্বাস করেন- আত্মাকে জানলেই পরমাত্মা বা সৃষ্টিকর্তাকে জানা যায়। কারণ আত্মা দেহে বাস করে। তাই বাউলরা দেহকে পবিত্র জ্ঞান করেন। বাউলদের মধ্যে সবাই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হন না। তবে তাঁদের আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও চিন্তা অনেক উন্নত হয়।
তথ্যসূত্র- উইকিপিডিয়া
