
বিপ্লব রায়।।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের ধর্মীয় সবচেয়ে বড় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা। নানা আয়োজনে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ এই উৎসব উদযাপন করেন। তাদের বিশ্বাস- শারদীয় দুর্গাপূজার মাধ্যমে মা দেবী দুর্গা স্বর্গে স্বামী মহাদেবের বাড়ি থেকে মর্ত্যধামে বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসেন। ষষ্ঠী তিথিতে মায়ের আগমন ঘটে। মর্ত্যে বা পৃথিবীতে এসে শিষ্টের পালন ও দুষ্টের দমন করেন দেবী দুর্গা। তাই তাঁকে দুর্গতিনাশীনিও বলা হয়। এজন্য প্রতি বছর দেবী দুর্গার আগমনী তিথিতে শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন করেন ভক্ত অনুরাগীরা। যদিও এই রীতি শুধু বাঙালিদের মধ্যেই বেশি দেখা যায়। মারাঠি বা গুজরাটি কিংবা তামিল বা মালয়ালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে শারদীয় দুর্গাপূজার আয়োজন তেমন নেই। তবে তারা মহা ধুমধামে উদ্যাপন করেন বিজয়া দশমী বা দশেরা উৎসব।
পড়তে পারেন- চৈত্র সংক্রান্তি: যেখানে বাঙালির প্রাণের বন্ধন
যেভাবে প্রচলন হলো বাঙালির হালখাতা
ষষ্ঠী থেকে অষ্টমী পর্যন্ত মণ্ডপে মণ্ডপে মহাধুমধামেই চলে পুজোর নানা যজ্ঞ। কিন্তু নবমীর পরই মন খারাপ হতে থাকে ভক্তদের। কারণ পরদিন বিজয়া দশমী। তাই এ তিথিতে মায়ের বিদায়ের প্রস্তুতি নিতে হয় মহানবমীতেই।
পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের দশমী তিথিতে পৃথিবীতে বাপের বাড়ি ছেড়ে কৈলাসে শ্বশুরবাড়িতে গিয়েছিলেন দুর্গতিনাশীনি দেবী দুর্গা। তাই এই তিথিকে বিজয় দশমী বা দশেরা বলা হয়।
বারো মাসে তেরো পার্বণের মধ্যে অন্যতম একটি পার্বণ দশেরা। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, রাবণ যখন সীতাদেবীকে হরণ করেছিলেন তখন রামচন্দ্র শরৎকালে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। কিন্তু লঙ্কাপতি রাবণ পরাক্রমশালী হওয়ায় তাঁকে সহজে পরাস্ত করা সম্ভব ছিল না। তখন রামচন্দ্র লঙ্কার রাজা রাবণকে পরাজিত করার জন্য দেবী দুর্গার পূজা করে রাবণ বধের বর চান। এই সময়ে পূজার উদ্দেশ্যে রামের আনা ১০৮টি নীলপদ্ম থেকে দুর্গা রামের ভক্তি পরীক্ষা করার জন্য একটি পদ্ম মায়াবলে সরিয়ে রাখেন।
রাম সেই একটি নীলপদ্মের পরিবর্তে নিজের চক্ষু তুলে দেবী দুর্গাকে অর্ঘ্য হিসেবে দান করতে ধনুকের তূণ থেকে তির তুলতে প্রস্তুত হন। এসময় দেবী সন্তুষ্ট হয়ে রামচন্দ্রকে চক্ষুদান করতে বারণ করে তাঁকে আশীর্বাদ করেন।
এবার জেনে নেওয়া যাক বিজয়া দশমী কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
কথিত আছে, ব্রহ্মার বর পেয়ে মহিষাসুর প্রবল শক্তিমান হয়ে এত বেপরোয়া হয়েছিলেন যে- তিনি স্বর্গ, মর্ত্য ও পাতাল দখল করে দেবরাজ ইন্দ্রকে স্বর্গ থেকে তাড়িয়ে দেন। কারণ ব্রহ্মা তাঁকে বর দিয়েছিলেন যে, কোনও পুরুষ তাঁকে হত্যা করতে পারবেন না। তখন সব দেবতা দেবী দুর্গার কাছে গিয়ে মহিষাসুর বধের জন্য প্রার্থণা করেন। এরপর মহিষাসুরের সঙ্গে টানা নয় দিন নয় রাত্রি যুদ্ধ করে দেবী দুর্গা দশম দিনে জয়লাভ করেছিলেন। দেবী দুর্গার এই বিজয়লাভকেই বিজয়া বলা হয়।
যদিও এই তত্ত্ব নিয়ে অনেকের মধ্যে দ্বিমতও রয়েছে। শ্রী চণ্ডীর কাহিনি অনুসারে, দেবী আবির্ভূত হন আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশী তিথিতে। আর মহিষাসুরকে বধ করেন শুক্লা দশমীতে। তাই এই দশমীর দিনকে বিজয় সূচক হিসেবে বিজয়া বলা হয়।
আবার উত্তর ভারতে বিজয়া দশমীকে বলা হয় ‘দশেরা’। মহাকবি বাল্মীকি মুনির রচনা করা রামায়ণে বলা আছে, আশ্বিন মাসের শুক্ল পক্ষের দশমী তিথিতে রামের অস্ত্রের আঘাতে রাবণ বধ হয়েছিলেন। রাবণ বধের ৩০ দিন পর সীতাকে উদ্ধার করে অযোধ্যায় ফিরে গিয়েছিলেন রামচন্দ্র। তাই এই দিনটিকে দশেরা হিসেবেও পালন করা হয়।
তবে ব্যাখ্যা যাই থাক, সব মত-দ্বিমতের উর্ধ্বে উঠে বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মেতে ওঠেন দুর্গাপুজোর মহা আনন্দে। তাই বিজয়া দশমী মানেই দুর্গা পুজোর অবসান। ভক্তদের হদয়ে বাজে বিষাদের সুর। নারীরা মেতে ওঠেন সিঁদুর খেলায়। মণ্ডপে মণ্ডপে কিংবা হিন্দুদের ঘরে ঘরে চলে একে অপরকে আলিঙ্গন। চলে পিঠে পায়েস তৈরির ধুম। এ দিনে ছোটরা বড়দের প্রণাম করেন শুভ বিজয়া বলে। এতে বড়রা সন্তুষ্ট হয়ে ছোটদের হাতে তুলে দেন আশীর্বাদের অর্ঘ্য (টাকা বা উপহার)।
এছাড়া মায়ের বিসর্জনের সময় ভক্তদের অনেকে ভেঙে পড়েন কান্নায়। অনেকে বলতে থাকেন ‘আসছে বছর আবার হবে’। এই আশা নিয়েই প্রতি বছর বিদায় জানানো হয় দুর্গতিনাশীনি দেবী দুর্গাকে।
