পুলকের লেখা যে গান গাইতে গিয়ে কেঁদেছিলেন মান্নাদে

পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় — আধুনিক বাংলা গীতিকার
পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্মরণীয় রূপ

বাণীবিতান ডেস্ক।।

ভারতীয় আধুনিক বাংলা গানে যিনি নেপথ্যে থেকে শ্রোতাদের হৃদয় জুড়ে রয়েছেন, তিনি পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর লেখা বহু গান আজো অমর সৃষ্টি হয়ে মানুষের হৃদয়ে বাজে। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্ট বেশির ভাগ গান কন্ঠে তুলে ভক্তদের কাছে পৌঁছে দিতেন আরেক কিংবদন্তী শিল্পী মান্নাদে। ভক্তরা বলতেন, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় আর মান্নাদে যেন একই বৃন্তের ঠিক যেন দুটি ফুল। কারণ পুলক না হলে যেন মান্নাদের চলতো না। ঠিক যেন মান্নাদে ছাড়াও পুলকের সব গান শ্রোতাদের পছন্দ হতো না। জীবনে গান লিখেছেন চার হাজারেরও বেশি। বলতে গেলে তাঁর প্রতিটি গানই সুপারহিট।

তবে সেই সুন্দরতম দিনগুলো স্থায়ী হয়নি পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। কী এক অজানা কষ্ট সব সময় মনে পুষে রাখতেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাইতো ১৯৯৯ সালের ৫ সেপ্টেম্বর গঙ্গাবক্ষে সমর্পণ করে পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিলেন তিনি।

গঙ্গায় ঝাঁপ দেওয়ার আগে ঠিক শেষ সময়ে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, “আমায় একটু জায়গা দাও, মায়ের মন্দিরে বসি!। যে গানটি শুনলে সংগীত প্রিয় যেকোন মানুষের হৃদয় দুলে উঠবে। মনের মধ্যে জেগে উঠবে মায়ের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁকে পাওয়ার আকুল বাসনা।

ছাত্রজীবন থেকেই যেকোন পরিস্থিতিতে গান-কবিতা লেখার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল পুলকের। কথা বলতে বলতেই সৃষ্টি হয়েছে তাঁর অসংখ্য অমর অবিনাশী গান।
এভাবেই একদিন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় গেলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় তখন স্নানে। বেশ কিছুক্ষণ পরে বাথরুম থেকে বেরিয়ে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দেখে তিনি বললেন- কতদিন পরে এলে, একটু বসো ! আর এই কথাতেই মনে মনে সৃষ্টি করলেন কালজায়ী সেই গানটি- “কতদিন পরে এলে একটু বোসো, তোমায় অনেক কথা বলার ছিল, যদি শোন !” যে গানটি এখনো হেমন্তু মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে নতুন হয়েই বাজে। এছাড়াও একগোছা রজনীগন্ধা হাতে দিয়ে বললাম, চললাম !

একবার বিমানে চড়ার সময় এক বিমানবালার রূপ সৌন্দর্যে পুলক এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, নিজেকে আর সামলাতে পারছিলেন না। ঠিক তখনই লিখে ফেললেন- ও চাঁদ সামলে রেখো জোছনাকে, কারো নজর লাগতে পারে !” এছাড়া সুন্দরী এক নারীর কান থেকে একটা ঝুমকো পড়ে যেতে দেখে লিখলেন “জড়োয়ার ঝুমকো থেকে একটি মতি খসে পড়েছে, আমি কুড়িয়ে নিয়েছি !”
তারপর,
“মা, মাগো মা, মা গো মা, আমি এলাম তোমার কোলে… , ক’ ফোঁটা চোখের জল ফেলেছো যে তুমি ভালবাসবে!, কী দেখলে তুমি আমাতে- আরো কত গান! তিনি বেশির ভাগ গানই লিখেছিলেন মান্নাদের জন্য। কারণ মান্নাদের কণ্ঠেই পুলকের গানগুলো যেন পূর্ণতা পেত।

আরতি বন্দ্যোপাধ্যায় গেয়েছেন, “এক বৈশাখে দেখা হল দুজনার !”
“যদি আকাশ হতো আঁখি !”
শ্যামল মিত্রের কণ্ঠে-“আমি তোমার কাছে ফিরে আসব !”
“ধরো কোন এক গানের পাখি !”
এছাড়া আরেক গুণী লতা মঙ্গেশকারের কণ্ঠে,
“আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাবো, হারিয়ে যাবো !”
“নিঝুম সন্ধ্যায় পান্থ পাখিরা !”
কিশোর কুমার গাইলেন,
‘আজ মিলনতিথির পূর্ণিমা চাঁদ মোছায় অন্ধকার !’ আহ! সে কী গান। কথা আর সুরে সুরে যেন ঠিক মিলন ঘটেছিল প্রকৃতিতেও।

“অমর শিল্পী তুমি কিশোর কুমার, তোমায় জানাই প্রণাম- পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা এই গানটিতে চারদিকে কুমার শানুর নাম ছড়িয়ে পড়েছিল।
একবার
হৈমন্তী শুক্লা’র অনুরোধে মান্না দে-র জন্য রেখে দেওয়া দুটো গান
হৈমন্তী’কে দিলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়।
‘আমার বলার কিছু ছিল না !’ এবং “ঠিকানা না রেখে ভালোই করেছ বন্ধু !” গান দুটো বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল তখন থেকেই। তাছাড়া হৈমন্তী শুক্লা নিরহঙ্কারী একজন মানুষ। তাই তাঁর কণ্ঠের জাদুও শ্রোতাদের আকৃষ্ট করেছে সহজে।

অথচ জীবনের শেষদিকে কী হয়েছিল পুলকের। মনে হয় পৃথিবীতে তাঁর হাত ধরে যে গানগুলো দিয়ে পাঠিয়েছিলেন, সেগুলো হয়তো সব দেওয়া শেষ হয়েছিল। তাই হয়তো ওপার থেকে প্রতিনিয়ত টান অনুভব করেছেন গুণী এই মানুষটি। এজন্য হয়তো প্রায়ই গঙ্গার ঘাটে একা গিয়ে বসে থাকতেন পুলক বন্দ্যোপাধায়। কিন্তু কেউ তাঁকে একটু বুঝতে পারলো না!
মৃত্যুর দু’দিন আগে, ৫’ই সেপ্টেম্বর শেষ গান লিখলেন,
“আমায় একটু জায়গা দাও,
মায়ের মন্দিরে বসি !!” এর দু’দিন পর পুলক ঝাঁপ দিলেন গঙ্গাবক্ষে। আর বাঁচানো গেল না তাঁকে। বাংলার আকাশ থেকে একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র অকালে উধাও হয়ে গেল। আর আমরা শুধু সেই বেদনা নিয়েই রইলাম।
জানা গেছে, পুলকের লেখা সেই গানটি পরে রেকর্ড করেছিলেন মান্না দে। তখন তাঁর চোখ যেন বার বার জলে ভরে গিয়েছিল।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top