হতদরিদ্র আমির খান যেভাবে বলিউড তারকা !.

বিপ্লব রায়॥

বলিউড অভিনেতা আমির খানের নাম সিনেমা পাগল সব মানুষেরই পছন্দের তালিকায়। এখন তাঁর কাড়ি কাড়ি পয়সা ও বিত্ত বৈভব থাকলেও, দারিদ্র্যতার কারণে এক সময় তিনি অভিনয়ের কথা ভাবতেও পারেননি তিনি। স্কুলের গন্ডি পার হতে না হতেই পড়াশোনা ছেড়ে দিতে হয়েছিল আমির খানকে। এরপর পুরান ঢাকার এক বন্ধুর সাহায্যে অভিনয়ে এসেছিলেন তিনি। আজ শোনাবো আমির খানের পেছনের গল্প।
——————–
ছোটবেলায় আর্থিক দৈন্যতার কারণে স্কুলের বেতন দিতে না পারায় শিক্ষকদের নির্দেশে আমির ও তাঁর অন্য ভাই-বোনকে ক্লাসে দাঁড়িয়ে থাকতে হতো। তাই প্রায়ই কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরতে হতো তাদের।

আমির খানের পুরো নাম মোহাম্মদ আমির হোসাইন খান। জন্ম ১৯৬৫ সালের ১৪ মার্চ, মুম্বাইয়ের হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে। তাঁর পরিবার ছিল রক্ষনশীল মুসলিম। যাদের পূর্বপুরুষেরা ভারতে এসেছিলেন আফগানিস্থান থেকে। তাঁর বাবা হলেন চলচ্চিত্র প্রযোজক তাহির হোসাইন আর মা জীনাত হোসাইন হলেন গৃহিনী।

খ্যাতনামা চলচ্চিত্র পরিচালক নাসির হোসাইন হলেন তাঁর চাচা। তাঁর পরদাদা হলেন ভারতের ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী মওলানা আবুল কালাম আজাদ। তাছাড়া তিনি হলেন ভারতের ৩য় রাষ্ট্রপতি ড. জাকির হুসেইনের বংশধর। ৫৪ বছর বয়সী এই অভিনেতা পরিবার নিয়ে বসবাস করেন মুম্বাইয়ের বান্দ্রা অঞ্চলের বিলাসবহুল এক বাড়িতে।

ভারতীয় সিনেমা জগতের ১০০ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যবসা সফল ছবির তালিকায় আমির খানের দাঙ্গাল ছবিটি রয়েছে সবার প্রথমে। এই তালিকার সেরা ২০ টি ছবির মধ্যে পাঁচটিই হলো আমির খানের।

তাঁর সম্পদের পরিমাণ প্রায় দুই বিলিয়ন রুপি। বিশালদেহী ছয়জন বডিগার্ড রয়েছে তাঁর সার্বক্ষণিক পাহাড়ায়।

আটবছর বয়সেই আমির খানকে দেখা যায় তাঁর চাচা নাসির হোসাইনের ইয়াদো কি বারাত ছবির একটি গানের দৃশ্যে। এটিই ছিলো সিনেমার পর্দায় তাঁর প্রথম অভিষেক। এরপর দশবছর তাঁকে আর সিনেমার পর্দায় দেখা যায়নি। এই সময়টায় তিনি মন দিয়েছিলেন পড়াশুনায়। আমির খান মূলত পড়াশুনা করেছিলেন উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত।

নিদারুণ আর্থিক কষ্টে কেটেছে আমির খানের বাল্যকাল। বাবা তাহির হোসাইনের ছবিগুলো একের পর এক ফ্লপ করছিলো আর সংসারের আর্থিক অবস্থা দিন দিন শোচনীয় হয়ে পড়েছিল। সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে আমির খান বলেন, তখন আমাদের বাড়িতে ঘন্টায় ঘন্টায় পাওনাদারদের ফোন আসতো, আমি সবসময় ভয়ে ভয়ে থাকতাম কখন জানি আমাকে আর আমার ভাইবোনদের স্কুল থেকে বের করে দেওয়া হয়।

চোখের সামনে বাবার সীমাহীন ব্যার্থতা দেখে একটি ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত ছিলেন, আর যাই করবেন না কেন ভুল করেও চলচ্চিত্রের দিকে পা বাড়াবেন না। কিন্তু সেই প্রতিজ্ঞা রক্ষয় হয়নি।

বাঙ্গালি বন্ধু আদিত্য ভট্টাচার্যের উৎসাহে শেষমেষ যুক্ত হলেন অভিনয়ের সঙ্গেই। কারণ আদিত্যের দাদুভাই ছিলেন কালজয়ী পরিচালক বিমল রায়। যিনি জন্মেছিলেন পুরাণ ঢাকায়। যদিও তাঁর জন্মের আগেই পরপারে চলে গেছেন বিমল রায়। কিন্তু সেই রক্তের ধারা আদিত্যকে ছাড়েনি।

সেজন্য আমিরকে নিয়েই ৪০ মিনিটের নতুন নির্বাক সিনেমা বানালেন আদিত্য। ছবিটির নাম প্যারানয়া, যার সাহায্যে অভিনয় জগতে এলেন আমির খান। এবার আর থামায় কে তাঁকে?

আমিরের অভিনয় দেখে হাজারো সুন্দরীর প্রস্তাব এসেছিল আমিরের। অথচ আমির যাঁকে ভালোবেসেছিলেন, তিনি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন সেদিনের আমিরকে। চারবারের মাথায় রক্ত দিয়ে প্রেমপত্র লিখে ঘায়েল করেছিলেন প্রতিবেশী রীনা দত্তকে। যাকে তিনি একুশ বছর বয়সে গোপনে বিয়ে করেন। অথচ মেয়েটিকে নিয়ে যে আলাদা সংসার পাতবেন সেই সামর্থ্যটুকুও ছিলো না তাঁর।

এরপর কাকার সহকারি হিসেবে কাজ করার সময় কিছু ডকুমেন্টারিতে অভিনয় করেন আমির। পরিচালক কেতন মেহতা সেই ডকুমেন্টারি দেখে হিরের এই টুকরোকে তুলে নেন। এরপর তাঁর অভিনয়ের পথ আরো খুলে যায়। একের পর এক সিনেমা হিট হয়ে যায় আমির খানের। ঘরে আসতে থাকে কাড়ি কাড়ি টাকা। এবার স্ত্রী রীনাকে নিয়ে একসাথে থাকতে শুরু করলেন তিনি। আর দুজনের পরিবারও মেনে নিলো তাদের বিয়ে। আর একসময় তাঁদের ঘর আলো করে এলো দুই সন্তান, ছেলে জুনায়েদ খান আর মেয়ে আইরা খান।

কিন্তু দুরন্ত বেগে ছুটে চললে গাড়ি অনেক সময় হোঁচট খায়। আমিরেরও বেলায়ও তেমন ঘটেছে। কারণ, লাগান ছবির শ্যুটিংয়ের সময় ভেঙে যায় তাঁর ১৬ বছরের সংসার। ওই স্যুটিংয়েই পরিচালকের সহকারী হিসেবে কাজ করতেন রূপবতী কিরণ রাও। অভিনয়ের পাশাপাশি এক সময় ভালো লাগা থেকে ভালোবাসায় গড়িয়ে যায় তাদের সম্পর্ক। সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক হয়ে যায় আমির খানের। দূর থেকে সবকিছুই দেখতেন স্ত্রী রীনা দত্ত। এভাবে ২০০২ সালে ভেঙে যায় তাদের সংসার।

বিচ্ছেদের তিন বছরের মাথায় ২০০৫ সালে আবার বিয়ে করেন আমির খান। এবার বউ করে নেন বলিউডের চলচ্চিত্র প্রযোজক ও পরিচালক কিরণ রাওকে। সেখানে এক পুত্র সন্তান হয় তাদের। কিরণ তার পুরো জীবনব্যাপীই একজন নিরামিষভোজী। স্ত্রীর প্রভাবে আমির খানও আমিষকে বিদায় জানিয়েছেন।

মজার বিষয় হচ্ছে, কখনো কোনো পুরস্কার গ্রহণ করতে অনুষ্ঠানে যান না আমির খান। এর কারণ হচ্ছে, ১৯৯০ সালে ‘দিল’ সিনেমার জন্য ফিল্মফেয়ার অনুষ্ঠানে তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেতা মনোনীত হয়ে পরবর্তীতে সানি দেওলকে তার ‘ঘায়েল’ সিনেমার জন্য পুরস্কারটি দেয়া হয়। এরপরই আমির খান পুরস্কার দেয়ার অনুষ্ঠানে যাওয়ায় ইতি টানেন।

তার প্রিয় বন্ধুর তালিকায় আছেন আরেক বলিউড তারকা সালমান খান। ভারতের ক্রিকেটরত্ন শচীন টেন্ডুলকারকেও পছন্দ করেন তিনি। পছন্দের রঙ কালো। প্রতিটি সিনেমায় তিনি পারিশ্রমিক নেন ৬০ কোটি রুপি। এসব নিয়েই চলছে তাঁর সংসার-অভিনয় সব। ভালো থাকুন প্রিয় অভিনেতা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top