রণদা প্রসাদ সাহা: এক দানবীরের গল্প

রণদা প্রসাদ সাহা
দানবীর রণদা প্রসাদ সাহা

বিপ্লব রায়।।

রণদা প্রসাদ সাহা ছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসের এক বিরল দানবীর ও মানবসেবক। আর পি সাহা নামেও অনেকের কাছে পরিচিত ছিলেন তিনি। রণদা প্রসাদ সাহাকে সবাই দানবীর হিসেবেই চিনেন। যিনি নি:স্বার্থ মানুষের মধ্যে অকাতরে দান করে গেছেন নিজের উপার্জিত সব অর্থ। তাইতো রণদা প্রসাদ সাহা সব সময়ই আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। তবে এটা ঠিক যে, এই যুগে বহু মানুষের কাড়ি কাড়ি অর্থ সম্পদ থাকলেও রণদা প্রসাদ সাহার মতো এমন দানবীর তেমন নেই।

সংগ্রামী, আত্মপ্রত্যয়ী মানবসেবক হওয়ায় সবার হৃদয়ের মধ্যমণি হয়ে উঠেছিলেন রণদা প্রসাদ সাহা। ১৮৯৬ সালের ১৫ নভেম্বর সাভারে মামাবাড়িতে উত্থান একাদশী তিথিতে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁদের বাড়ি টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে। কুমুদিনী সাহা ও দেবেন্দ্র নাথ সাহার গর্বের সন্তান ছিলেন রণদা প্রসাদ। ছেলে বেলায় বেশ দারিদ্রতার সঙ্গেই দিন কেটেছে তাঁর। কারণ মাত্র সাত বছর বয়সে বিনা চিকিৎসায় প্রাণ হারাতে হয় তাঁর মা কুমুদিনী সাহার। এতে তিনি হয়ে পড়েন আশ্রয়হীন।

চোখের সামনে মায়ের এই মৃত্যু মানতে পারেননি রণদা প্রসাদ। সেই থেকে মাতৃহারা শোককে ধীরে ধীরে শক্তিতে পরিণত করেন তিনি। মনে মনে স্থির করতে থাকেন-একদিন নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে তাঁকে। দাঁড়াতে হবে বঞ্চিত মানুষের সেবায়। কারণ আর কোন মানুষের যেন বিনা চিকিৎসায় প্রাণ হারাতে না হয়।

এদিকে মায়ের মৃত্যুর পর চেহারা বদলে যায় বাবা দেবেন্দ্রে নাথ সাহার। তাই মাযের মৃত্যুর কিছুদিনের মধ্যেই দ্বিতীয় বিয়ে করতেও দেরি করেননি তিনি। এরপর নতুন কালো অধ্যায় শুরু হয় শিশু রণদার জীবনে। প্রায় বন্ধ হয়ে যায় রণদার পড়াশোনা। এছাড়া একদিকে দারিদ্র্যের কঠোর কষাঘাত অন্যদিকে নেমে আসে সৎ মায়ের অবহেলা ও নির্যাতন। এসব কারণে অভাবের তাড়নায় মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে খাবার চেয়েও খেতে হয়েছে রণদা প্রসাদকে। তবুও ভয়ঙ্কর এই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা চলেছে শিশু রণদা প্রসাদের। এক সময়ে রোজগারের আশায় দিনমজুরের খাতায় নাম ওঠে রণদা প্রসাদের। কিছুদিনের মাথায় ক্ষোভে দু:খে চলে গেলেন কোলকাতায়। সেখানে যাওয়ার পর ভাগ্যের আকাশে আলোর রেখা দেখা দিতে শুরু হয় রণদা প্রসাদের জীবনে।

তাইতো ১৯১৪ সালের ২৮ জুলাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর পর কোলকাতায় গিয়ে সেনাবাহিনীর বেঙ্গল এম্বুলেন্স কোরে যোগ দিয়ে যুদ্ধের সময় ৩৮ জন সেনাসদস্যকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়ে সবার মধ্যমণি হয়ে ওঠেন। তাঁর অসাধারণ কর্মনিষ্ঠা, সেবাপরায়ণতা ও অসম সাহসিকতার খবর পৌছে যায় ইংল্যান্ডের রাজ দরবার পর্যন্ত। পুরষ্কার হিসেবে রাজা পঞ্চম জর্জ রণদাকে ‘সোর্ড অব অনার’ উপহার দিয়ে সম্মানিত করেন। এই সম্মান রণদা প্রসাদ সাহার জীবনের প্রথম জয়মাল্য।

এরপর জর্জ ভি নামে এক কর্মকর্তা তাঁকে রেলওয়ে বিভাগে টিটিইর চাকরি দেন। কিন্তু ভাগ্যের চক্রে সেখানেও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে চাকরিটি হারাতে হয় রণদা প্রসাদকে। তবে দমে বা থেমে যাননি তিনি। চাকরি করার সময় জমানো কিছু টাকা নিযে ১৯৩২ সালে কলকাতাতে প্রথমে লবণ ও পরে কয়লার ব্যবসা শুরু করেন রণদা প্রসাদ সাহা।

এ ব্যবসা থেকেই কপাল খুলে যায় তাঁর। একে একে সফল হতে থাকে ব্যবসায়। পরে বেঙ্গল রিভার নামে একটি জাহাজ কিনে নেন তিনি। এরপর নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও কুমিল্লায়ও তিনটি পাওয়ার হাউজ ক্রয় করেন। নারায়ণগঞ্জে জর্জ এন্ডারসন কোম্পানির পাটের বেল তৈরি করেন। পরবর্তী সময়ে চামড়ার ব্যবসা শুরু করে জীবনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন রণদা প্রসাদ। আর ব্যবসায় লাভের পাশাপাশি শুরু হয় তাঁর মানবসেবা।
সেই ধারাবাহিকতায় ১৯৩৮ সালে মির্জাপুর গ্রামের লৌহজং নদীর তীর ঘেঁষে মায়ের স্মৃতিতে প্রতিষ্ঠা করা হয় কুমুদিনী হাসপাতাল। এই হাসপাতালটি আজও নিরবচ্ছিন্ন ভাবে রোজ শত শত মানুষকে উন্নত চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। কুমুদিনী হাসপাতালটি এখন পরিণত হয় ৭৫০ শয্যায়। পরে নারী শিক্ষার জন্য তিনি কুমুদিনী হাসপাতাল ক্যাম্পাসেই ১৯৪২ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ভারতেশ্বরী হোমস। এছাড়া রণদা প্রসাদ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন কুমুদিনী নার্সিং স্কুল, টাঙ্গাইলের কুমুদিনী কলেজ, মানিকগঞ্জে দেবেন্দ্রনাথ কলেজ, মির্জাপুর বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ও মির্জাপুর এসকে পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান।

বহু ধন সম্পদের মালিক হলেও নিজের ভোগ বিলাসে ব্যয় করেননি রণদা প্রসাদ সাহা। নিজে অত্যন্ত সাদামাটা জীবন যাপন করে সব টাকা জমা দিতেন কুমুদিনী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গলে। এ ট্রাস্টের মাধ্যমেই তার নাতি কুমুদিনী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাজীব প্রসাদ সাহা মির্জাপুরে প্রতিষ্ঠা করেছেন কুমুদিনী মহিলা মেডিকেল কলেজ, নার্সিং কলেজ ও কুমুদিনী হ্যান্ডিক্রাফট। গ্রামের অবহেলিত, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্ত মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কুমুদিনী হাসপাতালে নার্স হিসেবে নিয়োগ দিতেন তিনি।

পড়তে পারেন ‘‘ স্টিভ জব্স: শূন্য থেকে শীর্ষে ওঠা এক জীবন যোদ্ধার গল্প’’

কিন্তু সেই সুখ কপালে সয়নি বাঙালির। এরই মধ্যে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। যুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালের ৭ মে পাকিস্তানী সেনা ও এ দেশের দোসররা তাঁর ২৬ বছর বয়সী ছেলে ভবানী প্রসাদ সাহা ও রণদা প্রসাদ সাহাকে ধরে নিয়ে হত্যা করে। তাদের লাশও খুঁজে পাওয়া যায়নি আজো।

রণদা প্রসাদ সাহার স্বজনরা জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর অনেকেই তাকে দেশত্যাগের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ছিলেন ব্যক্তিত্ব ও দেশপ্রেমে অনড়। তিনি বলতেন, দেশ ছেড়ে তো কাপুরুষরা পালায়। আমি কেন পালাবো?

১৯৭৮ সালে রণদা প্রসাদ সাহা বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাব ‘স্বাধীনতা পুরষ্কার’ (মরণোত্তর) পান। সমাজসেবায় অসামান্য অবদানের জন্য ১৯৮৪ সালে লাভ করেন ‘কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট’ স্বাধীনতা দিবস পুরষ্কার। এছাড়া ১৯৯১ সালে রণদা প্রসাদ স্মরণে একটি স্মারক ডাকটিকেট প্রকাশ করা হয়।

​রনদা প্রসাদ সাহা শুধু দানবীর ছিলেন না। ছিলেন দূরদর্শী, আত্মবিশ্বাসী ও অবহেলিত মানুষের বন্ধু। তাইতো তাঁর রেখে যাওয়া অসংখ্য প্রতিষ্ঠান আজো রোজ হাজারো মানুষকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে অবিরত। এই মহামানবের প্রতি আমাদের গভীর শ্রদ্ধা।

তথ্যসূত্র: শিক্ষা বাতায়ন, দৈনিক ইত্তেফাক অনলাইন

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top