মৃত্যুর পরে বিখ্যাত হয়েছিলেন যাঁরা

বাণীবিতান ডটকম ডেস্ক।।

সাম্যের কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর কবিতার ভাষায় লিখেছিলেন, ‘যখন আমি হারিয়ে যাব। বুঝবে তখন বুঝবে। অস্তপাড়ের সন্ধ্যা তারায়, আমার খবর পুছবে।’ হয়তো এ যুগের কিছু মানুষের না পাওয়ার বেদনার মনোভাব বুঝেই অনেক অভিমানে তিনি লিখেছিলেন এই কথাগুলো। বাস্তবে ঘটেছেও ঠিক তাই।

এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা সারাটা জীবন জ্ঞান অন্বেষণ ও জ্ঞান ছড়ানোর কাজে নিয়োজিত ছিলেন। কিন্তু বেঁচে থাকতে মানুষের কাছে তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকুও পাননি। ভালোবাসার পরিবর্তে অনেকে ভাগ্যে জুটেছে অর্থ সংকট, অনাহার আর অর্ধাহারের মানবেতর জীবন। অনেককে থাকতে হয়েছে এক ঘরে হয়ে। তাদের মধ্যে এমনই একজন মহাকাশ বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি।

গ্যালিলিও গ্যালিলি
প্রচলিত ধর্ম বিশ্বাসে অন্য বেশির ভাগ মানুষের সঙ্গে মতের মিল ছিল না। তাই এক রকমের একঘরেই থাকতে হয়েছে বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলি’কে। নিজের আবিষ্কার নিয়েও সহ্য করতে হয়েছে প্রায় সব মানুষের সমালোচনা। কারণ তিনি টেলিস্কোপ আবিষ্কার করে, এমন এক সত্যের সন্ধান পেয়েছিলেন, যা সৌরজগৎ সম্পর্কে সামাজিকভাবে স্বীকৃত সত্যকে এক নিমেষে মিথ্যায় পর্যবসিত হয়েছিল। তিনি বারবার বলেছিলেন, সূর্য পৃথিবীকে নয়, বরং পৃথিবীই সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘোরে। তখনকার দিনের মানুষ এই কথাটিকেই বলেছিলেন, এই মতবাদ ধর্মের বিরুদ্ধে।

এই তত্ত্ব আবিষ্কারের পর ধর্মবিরোধিতার অভিযোগে সবার চরম শত্রু হতে তাঁকে। শুধু তাই নয়, তাঁর বিরুদ্ধে এই অভিযোগ তুলে বিচারের কাঠগড়ায় তুলে করা হয় গৃহবন্দি। এভাবে বন্দীদশায় থেকে আট বছরের মাথায় ১৬৪২ সালে মৃত্যুবরণ করেন এই মহাবিজ্ঞানী।

কিন্তু সবচে মজার ব্যাপার হচ্ছে, তার মৃত্যুর প্রায় ১৯৩ বছর পর ১৮৩৫ সালে তার আবিষ্কারের সত্যতা বুঝতে পারে সবাই। তখন তাঁর সব কাজের উপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় চার্চ কর্তৃপক্ষ। জয় হয় বিজ্ঞানের। কারণ বর্তমান বিশ্বে পৃথিবীর প্রায় সব মানুষই একবাক্যে স্বীকার করে গ্যালিলিও গ্যালিলির বক্তব্য। বর্তমানে তিনি আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের জনক হিসেবেও পরিচিত। অথচ জীবদ্দশায় এই বিজ্ঞানীকে বুঝতে পারেনি কেউ।

ভিনসেন্ট ভ্যান গগ
এরপর এই দলের যাঁর কথা বলবো। তিনি হচ্ছেন ভিনসেন্ট ভ্যান গগ। নক্ষত্রখচিত রাতের ছবি এঁকেছিলেন এই গুণী মানুষটি। তিনি দেখিয়েছিলেন, আকাশের নক্ষত্র যেমন দৃশ্যমান হয় পৃথিবীর বুকে রাত্রির ঘনকালো অন্ধকারে, ভ্যান গগও তেমনই শিল্পী হিসেবে নিজের প্রাপ্য সম্মান ও খ্যাতিটুকু পেয়েছেন ঠিকই। তবে তা বেঁচে থাকতে নয়। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে ১৮৯০ সালে নিজের পেটে গুলি চালিয়েছিলেন তিনি। এরপর জীবনের সঙ্গে প্রায় ৩০ ঘণ্টা লড়াইয়ের পর শেষ নিঃশ্বাসটুকু চলে যায় তাঁর।

তিনি বেঁচে থাকতে কেউ বোঝেননি তাকে। বোঝার চেষ্টাও করেনি। আর এজন্যই স্বচক্ষে নিজের মাত্র একটি চিত্রকর্মকে বিকোতে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল তার। অথচ তার আঁকা সেই ছবিগুলোই আজ অর্থ দিয়ে পরিমাপ করা হয়ে পড়েছে দুঃসাধ্য। তার আঁকা ছবিগুলো দেখতেই আজ লন্ডন, প্যারিস, আমস্টারডাম কিংবা নিউইয়র্ক সিটির বিভিন্ন জাদুঘরে লেগে থাকে শিল্পানুরাগীদের উপচে পড়া ভিড়।

গ্রেগর জোহান মেন্ডেল
গ্রেগর জোগান মেন্ডেল একজন বড় মাপের বিজ্ঞানী ছিলেন। জিনতত্ত্ব বা বংশগতি নিয়ে কাজ করতেন তিনি। কিন্তু তাঁর এই গবেষণার গুরুত্ব কেউ বোঝেনি তখন। তাই তিনি ছিলেন কিছুটা অভিমানী প্রকৃতির। তিনি ভাবতেন, তাঁর গবেষণায় সফল হলে সবাই একদিন বুঝবে তাঁকে। তাই তিনি নিজেও নিজেকে কখনো প্রমাণের চেষ্টা করতেন না। তবে মানুষের এই অবহেলায় কষ্ট পেতেন মনে। তাই বারবার মানসিকভাবে ভেঙেও পড়তেন। তবে আবার মনের ভেতর প্রবল জোর নিয়ে জেগেও উঠতেন শক্তি হয়ে। আবার বসতেন গবেষণায়।

এভাবেই একদিন মটরশুঁটির বংশগতির সূত্র আবিষ্কার করলেন গ্রেগর জোগান মেন্ডেল। মটরশুঁটির পর তিনি গবেষণা শুরু করেছিলেন মৌমাছি নিয়েও। কিন্তু তা শেষ হওয়ার আগেই ১৮৮৪ সালে পৃথিবী থেকে চির বিদায় নেন অভিমানী এই বিজ্ঞানী।

তার মৃত্যুরও অনেক বছর পর অন্যান্য বিজ্ঞানীরা একই বিষয়ে গবেষণা করে জেনেছেন যে, গ্রেগর জোগান মেন্ডেল মটরশুঁটির মাধ্যমে বংশগতির যে সূত্র আবিষ্কার করেছিলেন, তা শুধু মটরশুঁটির জন্যই নয়, প্রায় সকল উদ্ভিদ, পশু-পাখি এমকি মানুষের ক্ষেত্রেও সত্য। সবাই এই তত্ত্ব বুঝেছিলেন ঠিকই, তখন এই মানুষটি পৃথিবী থেকে যোজন যোজন মাইল দূরে। সেই তিনিই বর্তমানে বিবেচিত আধুনিক বংশগতির জনক হিসেবে! (গ্রেগর 

এডগার অ্যালেন পো

এবার বলবো সংগ্রামী লেখকদের পোস্টার বয় হিসেবে পরিচিত এডগার অ্যালেন পো’র কথা। সারা জীবন দুঃখ-দুর্দশায় থেকেও ধ্রুপদী সাহিত্য রচনা করে বিখ্যাত হয়েছিলেন। তবে তাও মৃত্যুর পরে। কারণ জীবদ্দশায় তিনি একের পর এক সাহিত্য রচনা করলেও কেউ তাকে পাত্তা দেয়নি। এসব নানা কারণে পো’য়ের মধ্যে বিষণ্নতা ছিল বেশ। তবে তা প্রকট আকার ধারণ কওে তাঁর স্ত্রীর মৃত্যুর পর। দু’বেলা ভাতের যোগাড় করাও তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল। তাই আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন মদের নেশায়। মদ পান করে এলোমেলো জীবন যাপন করে এক সময় আত্মহত্যারও চেষ্টা চালান পো। পরে ১৮৪৯ সালে রহস্যজনক ভাবে মৃত্যু হয় তাঁর। এরপরই শুরু হয় তাঁর সাহিত্য সন্ধানের। শুরু হয় পো’র জন্য সবার উচ্চকিত প্রশংসা। তিনি গণ্য হন আমেরিকান রোমান্টিক আন্দোলনের অন্যতম লেখক হিসেবে। তিনি ছিলেন গোয়েন্দা ছোট গল্পেরও পথিকৃৎ। সব মিলিয়ে বিশ্বসাহিত্য অঙ্গণে পো আজ এক অনন্য আসনে অধিষ্ঠিত।

এমিলি ডিকিনসন

আজ যদি কখনো আপনি মার্কিন মুলুকের কোনো পাঠাগারে যান, তাহলে সেখানে থরে থরে সাজানো দেখতে পাবেন এমিলি ডিকিনসনের নামে শত শত বই। এসব বই সব তাঁর নিজের লেখা নয়। তবে তাঁকে নিয়ে অনেক গবেষকের রচনাগ্রন্থও আছে সেখানে। এমিলি ডিকিনসন যখন জীবিত ছিলেন, তখন তাঁকে নিয়ে কারো বিন্দুমাত্র আগ্রহ ছিল না। অথচ মৃত্যুর পরে মানুষ বুঝতে পেরেছে, তিনি কতবড় মাপের মানুষ ছিলেন।
কারণ ১ হাজার ৮০০ কবিতা লেখা ডিকিনসন বেঁচে থাকতে ছাপিয়েছিলেন মাত্র ১০ থেকে ১২টি। তাই তো তিনি আজও সবার কাছে পরিচিত ‘নির্জনতার কবি’ হিসেবে।

অবশ্য নির্জনতায় বাস করতেন ডিকিনসন। তিনি ছিলেন অতিমাত্রায় লাজুক ও অন্তর্মুখী স্বভাবের একজন মানুষ। তাই কখনো খামখেয়ালি করেও দিন কাটাতেন ডিকিনসন। যা তাকে ম্যাসাচুসেটস শহরের অন্য দশজন তাদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। অনেকেরই বিশ্বাস, ব্যর্থ প্রেম কবি ডিকিনসনের মনকে গভীর ভাবে নাড়া দিয়েছিল। আর সেই ভালোবাসার প্রতিফলন তাঁর লেখনিতে ফুটে উঠেছে। তিনি লিখেছেন এক অভূতপূর্ব অন্তর্জগতের প্রতিবিম্ব। যেই অন্তর্জগৎ উৎসারিত হয়েছে সত্যকে জানার অদম্য আকাক্সক্ষা, প্রেম ও মৃত্যু চিন্তা থেকে। ফলে ১৮৮৬ সালে তার দেহাবসানের পর যখন তার কবিতাগুলো প্রকাশ হতে শুরু করল, তখন থেকেই তাঁর প্রতি জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু হলো। যা হয়তো বেঁচে থাকতে কোনোদিন কল্পনাও করেননি এমিলি ডিকিনসন।

হারমান মেলভিল

হারমান মেলভিলকে এক প্রকার ভাগ্যবানই বলা যায়। কারণ তাঁর জীবদ্দশায় সাফল্য-ব্যর্থতা দুইয়ের স্বাদই পেয়েছেন তিনি। লেখালেখি শুরুর পর চারদিকে বেশ ভালোই সুনাম কুড়িয়েছিলেন তিনি। কিন্তু সেই সুনাম ধরে রাখতে পারেনি হারমান মেলভিল। ফলে একটি সাদা তিমিকে নিয়ে যখন তিনি লিখেছিলেন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসটি, যা আজ ‘মবি ডিক’ নামে সারা বিশ্বে অতিপরিচিত, তখন সেটির দিকে মানুষ ফিরেও তাকায়নি। লেখালেখির মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করতে না পারায় নিশ্চিত কোনো আয়ের আশায় তিনি কাস্টম ইন্সপেক্টর হিসেবে চাকরি নিয়েছিলেন। সেই চাকরি দিয়ে নিজের ন্যূনতম রোজগার করতে বেগ পেতে হয়ে তাঁর। অথচ মেলভিলের শেষ জীবনে এসে দেখা গেছে, বাজারে তাঁর সব বই বিক্রি হয়ে গেছে।

লেখালেখির মাধ্যমে মেলভিলের সারা জীবনের আয় ছিল মাত্র ১০ হাজার ডলার। তখনকার দিনে ১০ হাজার ডলার হয়তো খুব কম না, কিন্তু যখন শুনবেন সেটি সারাজীবনের উপার্জন, তখন অংকটিকে নেহাতই খেলো মনে হবে। এসবের মধ্য দিয়েই ১৮৯১ সালে মৃত্যুবরণ করেন মেলভিল।

স্টিগ লারসন

তালিকায় এবার রয়েছে স্টিগ লারসনের নাম। তিনি বিশ্বের দরবারে এক নামে পরিচিত মিলেনিয়াম ট্রিলজির লেখক হিসেবে। ট্রিলজিটি বিবেচিত হয় ক্রাইম থ্রিলার জনরার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসেবে। অথচ মজার ব্যাপার হলো, জীবিতাবস্থায় থ্রিলার সাহিত্যে স্টিগ লারসনের অসামান্য লেখনী প্রতিভা সম্পর্কে অবগত ছিল না কেউই। তিনি তখনো ছিলেন নিতান্তই একজন স্বল্পপরিচিত সুইডিশ সাংবাদিক।

২০০৪ সালে লারসনের মৃত্যুর এক বছর পর মিলেনিয়াম ট্রিলজির প্রথম বই ‘দ্য গার্ল উইথ দ্য ড্রাগন ট্যাটু’ প্রকাশিত হয়। জানা গেছে, লারসনের অকাল মৃত্যুর পর তাঁর রচিত তিনটি উপন্যাসের পান্ডুলিপি উদ্ধার করে ২০০৫ সালে প্রকাশ করা হয়। এই বই বাজারে আসার পর পাঠকদের কেনার হিড়িক লাগে। এভাবে ২০০৮ সালে লারসন পরিণত হন বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বিক্রিত লেখকে। আর ২০১০ সালে লারসনের এক মিলিয়ন বই বিক্রি হয় অ্যামাজন মার্কেট প্লেসে। ওই একই বছর যুক্তরাষ্ট্রের বর্ষসেরা লেখক সম্মাননাও দেওয়া হয় তাঁকে।

অ্যান ফ্রাঙ্ক

এ তালিকার সবচেয়ে অনুমিত নাম অ্যান ফ্রাঙ্কের। তিনি এমন একজন যিনি শুধু মৃত্যুর পরই জনপ্রিয়তা পাননি, বরং মৃত্যুই তাঁকে মানুষের কাছে নন্দিত করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন হলোকাস্টের অন্যতম ভিক্টিম ছিলেন ফ্রাঙ্ক। সে সময়ে তিনি নিতান্তই এক কিশোরী। নিজের দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা হৃদয় উজাড় করে দিয়ে তিনি ব্যক্ত করেছিলেন তার দিনলিপিতে। মৃত্যু ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর অ্যান ফ্রাঙ্কের দিনলিপিটি বই আকারে প্রকাশিত হওয়া মাত্রই বইটি পরিণত হয়েছিল পাঠকদের আগ্রহের শীর্ষে।

শেষ কথা
এতক্ষণ ধৈয্য ধরে বাণীবিতান ডটকমের এই লেখাটি পুরোপুরি মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন, তারা একটি বিষয় নিশ্চয়ই খেয়াল করেছেন যে (অ্যান ফ্রাঙ্ক বাদে) প্রত্যেকেই ছিলেন তুখোড় মধাবী। যাঁদের সৃষ্টিশীলতার গভীরতা ছিল অসীম। তবুও বেঁচে থাকতে তাদের ভাগে প্রাপ্য সম্মান ও স্বীকৃতিটুকু জোটেনি। তবে অনেক দেরিতে হলেও, তারা সেই অনাস্বাদিত সম্মান ও স্বীকৃতি ঠিকই পেয়েছেন মৃত্যুর পর।
আজ যারা স্বীকৃতির আশায় মাথা কুটে মরছেন তবু সাফল্যের দেখা পাচ্ছেন না, তারা এত সহজে আশাহত হবেন না। কে জানে, মহাকাল হয়তো আপনাদের গল্পটাও একটু ভিন্নভাবেই সাজিয়ে রেখেছেন!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top