বেয়ার গ্রিলস: ওয়াইল্ড সিরিজের দু:সাহসী যোদ্ধার নেপথ্যের গল্প

বাণীবিতান ডেস্ক।।

টিভিতে শো দেখেছেন, কিন্তু বেয়ার গ্রিলসের দু:সাহসী পাগলামি দেখেননি, এমন মানুষ খুব বেশি পাওয়া যাবে না। ডিসকভারে চ্যানেল খুললেই একবার না একবার বেয়ার গ্রিলসের অনুষ্ঠান না হয় তার কোনো প্রোমোশনাল আসবেই। আর তার দু:সাহসিক ভিডিও একবার কেউ দেখলেই কুপোকাত। মানে চোখ আর সরানো যাবে না। মনের মধ্যে সৃষ্টি হবে কৌতুহল। এই মানুষটি কে? এগুলো যা করছে তা কি সতি? নাকি গ্রাফিক্সের কোনো কূটচাল! প্রথম দেখাতে বেশিরভাগ মানুষেরই এমন মনে হয়।

বেয়ার গ্রিলস নদী, সমুদ্র, গভীর জঙ্গল, গাছ, নদীর তীর এসব জায়গায় গিয়ে তার দুঃসাহসী কর্মকাণ্ড দেখিয়ে টেলিভিশনের দিকে চোখ টেনে রেখেছেন ছোট-বুড়ো সকলকে। কারণ, তিনি দেখান-গভীর জঙ্গলে গিয়ে কীভাবে পোকামাকড়, সাপ, কুচে এ জাতীয় প্রাণী খেয়ে বিপদের মধ্যেও বেঁচে থাকা যায়। কীভাবে মরুভূমির চোরাবালিতে আটকে গেলেও জীবন বাঁচাতে হয়? কীভাবে সমুদ্রের ঢেউয়ের মধ্যে কিনারে ফিরতে হয়।

বেয়ার গ্রিলসের কীর্তি দেখলে নিজের চোখকেই বিশ্বাস হয় না। কীভাবে একজন মানুষ এভাবে একের পর এক দিন-রাত কাাটিয়ে দেয়। তাও কখনো কাঁচা আবার কখনোআধা পোড়া খাবার খেয়ে। ভয়ঙ্কর জঙ্গল, কিংবা গাছের নিচে তাবু টাঙিয়ে আবার কখনো বা গাছের ওপর টঙ বানিয়েই যেখানে রাত, সেখানে কাত এই মানুষটির। কিন্তু কখনো কী জেনেছেন তিনি আসলে কে? কী করেন? তাঁর বাড়ি কোথায়? আজ এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো।

বেয়ার গ্রিলসের ব্যক্তিগত জীবন: তাঁর আসল নাম এডওয়ার্ড মাইকেল গ্রিলস। জন্মেছিলেন আয়ারল্যান্ডে। তারিখ ছিল ১৯৭৪ সালের ৭ জুন। তার মাতামহ-প্রমাতামহ খুব ভালো ক্রিকেট খেলোয়াড় ছিলেন। খেলেছেন ইংল্যান্ডের বহু স্থানীয় এবং আঞ্চলিক দলেও।

বেয়ার গ্রিলসের বাবার নাম মাইকেল গ্রিলস। তিনি ছিলেন ব্রিটিশ নৌবাহিনীর রয়্যাল ইয়ার্ডস স্কোয়ারডন স্যাইলর। এজন্য ছোটবেলা থেকেই অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ পেয়েছিলেন এডওয়ার্ড গ্রিলস। ওইসময়েই স্কাই ডাইভিংয়ে হাতেখড়ি তার। জন্মের পর তাঁর নামের আগে বিয়ার যুক্ত ছিল না। তার জন্মের সপ্তাহ-দশেক দিনের মধ্যেই তাকে বেয়ার নামে ডাকা শুরু করেছিলেন এডওয়ার্ড মাইকেল গ্রিলসের বড়বোন লারা ফসেট। সেই থেকে সংক্ষেপে তার নাম হয়ে গেল বেয়ার গ্রিলস।

ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত ’21 SAS Regiment’ এর একজন প্যারাট্রুপার ছিলেন গ্রিলস। একবার জাম্বিয়ায় প্যারাসুট ট্রেনিংয়ের সময় মারাত্মকভাবে আহত হয়ে তার মেরুদণ্ডের তিনটি হাড় ভেঙে যায়। চিকিৎসক এসময় তাঁর স্বজনদের জানিয়ে দেন, গ্রিলসকে আর কখনোই স্বাভাবিক জীবনে ফেরানো সম্ভব হবে না। কিন্তু চিকিৎসকের এই কথায় সাধারণরা হতাশ হলেও, মনোবল হারাননি গ্রিলস। এ ঘটনার মাত্র
মাত্র দেড় বছরের মাথায় তিনি ভারতের পশ্চিম বাংলা ও সিকিম ভ্রমণে আসেন এভারেস্টে চড়ার প্রস্তুতি নিতে। এ যেন গ্রিলসের মস্তবড় এক পাগলামি। সবাইকে তাক লাগিয়ে ১৯৯৮ সালের ১৬ মে দুর্গম এভারেস্ট জয় করেন তিনি। এরপর আর ঠেকায় কে বেয়ার গ্রিলসকে। তাঁর পুরস্কার হিসেবে ২০০৪ সালে বেয়ারকে রয়্যাল ন্যাভাল রিসার্ভের লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সম্মান প্রদান করা হয়। ২০১৩ তাকে বানানো হয় লেফটেন্যান্ট কর্নেল অব রয়্যাল মেরিন রিজার্ভ। ২০২১ সালের জুন মাসে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর কর্নেল উপাধিতে ভূষিত হন অকুতোভয় এই যোদ্ধা।

সারা বিশ্বের দর্শকদের কাছে এমন জনপ্রিয়তা পেয়েছেন গ্রিলস, যে ডিসকভারি চ্যানেল মানেই তাঁর দু:সাহসিক অভিযান দেখতে চাওয়া। তাঁর শোয়ের মাঝখানে বিজ্ঞাপন বিরতিতেও বিরক্ত হয়ে ওঠেন দর্শকরা। তাই ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড শো মানেই বেয়ার গ্রিলস।

বেয়ার গ্রিলসের শো সবার কাছে বেশি আকর্ষণের প্রধান কারণ ছিল গভীর জঙ্গলে গিয়ে অদ্ভুত সব জীবজন্তু ধরে খেয়ে ফেলা। ছোটখাট পোকামাকড়, বিচ্ছু, পচা মাংস, ভালুকের মল, বিষধর সাপ, নাকি নিজের মূত্র এসব খেতেন। বেয়ার গ্রিলসের ভাষায়, ছাগলের অণ্ডকোষ ছিল তার খাওয়া সবচেয়ে বাজে খাবার। যেটা খেয়ে তাকে বমি পর্যন্ত করেছিল। অথচ সৌদি আরবের যাযাবর বহু জাতি-গোষ্ঠী সেই খাবার প্রতিদিন তৃপ্তি মিটিয়েই খায়।

এসব লোমহর্ষক ঘটনা নিয়ে ডিসকভারি চ্যানেল ২০০৬ সালের ৬ মার্চ ‘দ্য রকিজ’ নামে পাইলট এপিসোড রিলিজ দিলেও পরবর্তী এপিসোড এয়ার হতে সময় লেগে যায় অনেক। দীর্ঘ ৮ মাস পর আসে দ্বিতীয় এপিসোড। এরপর ২০১১ সালের ২৯ নভেম্বর সপ্তম সিজন পর্যন্ত ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ডের মোট ৭৩টি এপিসোড রিলিজ হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশে গ্রিলসের শো ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড নামে পরিচিত। কিন্তু এই শো নির্মিত হওয়া দেশ যুক্তরাজ্যে একে ‘Born Survivor’ নামে ডাকা হয়। এর পাশাপাশি অনেক দেশে আবার এটি ‘Ultimate Survival’ নামেও প্রচারিত হয়।

তবে টিভি স্ক্রিনের নেপথ্যের কিছু ঘটনায় জানা গেছে, অনুষ্ঠানের স্থান হিসেবে এমন জায়গা বাছাই করা হয়, যা মানবসভ্যতা থেকে খুব বেশি দূরে নয়। এমনও শোনা যায় যে, কিছু এপিসোডে বেয়ার হোটেলে এসে রাত কাটিয়েছিলেন। এমনকি একটি পর্বে ভালুকের স্যুটও পরেছিলেন তিনি। ২০০৭ সালে প্রচারিত হওয়া এক পর্ব ছিল আগ্নেয়গিরি সম্পর্কিত। ওই এপিসোডের কিছু দৃশ্য ফুটিয়ে তোলার জন্য আগ্নেয়গিরির ধোয়া দেখাতে নকল কিছু ধোঁয়া ব্যবহার করেছিল ম্যান ভার্সেস ওয়াইল্ড টিম।

তবে এখন আর ডিসকভারির সঙ্গে নেই গ্রিলস। ২০১২ সালের ডিসকভারির সাথে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। যদিও চ্যানেল তাকে ছাড়তে চায়নি। ২০১৯ সাল থেকে বর্তমানে তিনি যুক্ত আছেন নেটফ্লিক্সের সঙ্গে। সেখানে ‘You vs Wild’ নামে একটি নতুন শো রিলিজ করেন তিনি।

টিভি স্ক্রিনে ঝক্কি ঝামেলার সঙ্গে কাটালেও  ব্যক্তিগত জীবন অনভ্যাবেই কাটান বেয়ার গ্রিলস। তাই স্ত্রী সন্তান নিয়ে অবকাশ যাপনের জন্য ২০০১ সালে ৯৫ হাজার ইউরো দিয়ে সেন্ট টুডওয়াল’স ওয়েস্টের দ্বীপের ২০ একর নির্জন জায়গা কিনে গড়েছেন স্বপ্নের কুটির।  দ্বীপের চারপাশে শুধু অথৈ জলরাশি। নেই বিদ্যুৎ সরবরাহের কোনো ব্যবস্থা। শুধু আছে একটা বাতিঘর। নিজে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে মাঝেমধ্যে সেখানেই হয় তাদের অবকাশ যাপন।

কৃতজ্ঞতা: রোর মিডিয়া আর্কাইভস

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top