
বিপ্লব রায়।।
ও আকাশ প্রদীপ জ্বেলো না, ও বাতাস আঁখি মেলো না
আমার প্রিয়া লজ্জা পেতে পারে…..
যে গান চির সবুজ। চির সতেজ। এ যে প্রিয়ার জন্য আকুলতা! গভীর প্রেম! গোপন অভিসার। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায় তাইতো সুর বেঁধে নিজের কণ্ঠে তুলে নিয়েছিলেন হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। অতুলনীয় যে সম্মিলনের দোলায় দুলে আজো যে কেউ হারিয়ে যায় অভিসারে। এ যেন গান নয়, অমৃত স্বাদের কথা ও সুরের অপূর্ব সম্মিলন। এবার এই একটি গানেরই আরো ক’টি চরণ-
তার সময় হল আমায় মালা দেবার
সে যে প্রাণের সুরে গান শোনাবে এবার।
সেই সুরেতে ঝর্না তুমি চরণ ফেলো না।
পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা ও ভূপেন হাজারিকার সুরে লতা মঙ্গেশকরের কন্ঠে সুরের আকাশে সুখতারার মতো এসেছিল আরো একটি গান- “রঙিলা বাঁশিতে কে ডাকে”। এমন বহু গানের স্রষ্টা পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে অন্তরালেই থাকতে হয় এসব গুণীদের। তাই এসব গানের শিল্পীদের সবাই চিনলেও পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা গৌরী প্রসন্ন ঘোষ- এদের সবাই চিনেন না।
ছোটবেলা থেকেই শব্দ নিয়ে খেলতেন পুলক। সৃষ্টি করতেন নতুন নতুন কবিতা। গল্প। কিন্তু পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এসব গুণের কথা প্রকাশ পায় কলেজ জীবনের শুরুতে। ‘ভারতবর্ষ’ মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার লেখা প্রথম গল্প। তাঁর লেখা প্রকাশিত হওয়ার পর পাঠক মহলে বেশ সাড়া পড়ে যায়। সবাই জানতে শুরু করেন- কে এই পুলক! এভাবে কিছু দিনের মধ্যেই গীতিকার হিসেবেই সবার কাছে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন যুবক পুলক। পরিস্থিতি বিবেচনায়ও তাৎক্ষণিক উপযুক্ত শব্দের মিলন ঘটিয়ে গান লেখার গভীর দক্ষতা ছিল পুলক বন্দোপাধ্যায়ের।
এ নিয়ে একটা মজার ঘটনা বলি। একবার পূজোর গান নিয়ে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বাড়িতে গেলেন পুলক বাবু। হেমন্ত বাবু পুলককে দেখে বললেন, “পুলক, কতদিন পরে এলে; একটু বসো।” সেই কথাটিই পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনে গেঁথে গেলো। এবার আর ঠেকায় কে।
আর সেই কথাটাই যেন পুলক বাবুর মনের মধ্যে গেঁথে গেল। হেমন্ত বাবু চোখের আড়াল হতেই খাতা কলম নিয়ে লিখে ফেললেন জনপ্রিয় সেই গান। কতদিন পরে এলে; একটু বসো..তোমায় অনেক কথাই বলার ছিল..যদিই শোনো। আর হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ও রত্ন চিনতে ভুল করেননি। পুলকের এই কথায় সম্মোহনী সুর দিয়ে নিজের কণ্ঠে তুলে নিলেন গানখানি। এরপর থেকেই তো গানটি চির অমর। চির সতেজ।
পুলকের বহু গান গেয়েছেন মান্নাদে। সেসব গান এখনো মানুষ মান্নাদের গান বলেই জানেন। কিন্তু পুলকের গান কেউ বলেন না। ‘কে প্রথম কাছে এসেছি, কে প্রথম ভালো বেসেছি” এ গানটিও বেঁধেছিলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। যে গান বলে দেয় প্রিয়ার সঙ্গে ভালোবাসার গল্প। বলে দেয় প্রথম প্রেমের গল্প। এ গানে প্রিয় মুহূর্তের কথাটাই যেন স্মরণ করিয়ে দেয় বার বার।
মান্না দে’র সাথে পুলক বন্দোপাধ্যায়ের সাথে সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। একবার এক অনুষ্ঠানে ভূপেন হাজারিকা মান্না দে-কে বললেন, “মান্না, কী করে তুমি এত সুন্দর করে গান গাও বলো তো?” উত্তরে মান্না দে বিনয়ের হাসি হেসে বললেন, “এই জীবনে যদি পুলকের জন্ম না হতো, তাহলে মান্না দে’রও জন্ম হতো না”। তাঁর এই কথাই বলে দেয়, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি কত ভালো বাসতেন। সম্মান করতেন।
পুলক বাবু একদিন মান্না দের বাড়িতে গিয়ে দেখলেন বন্ধু রান্নায় ব্যস্ত। তখন তিনি বসার ঘরে এসে কাগজে কিছু লিখে ফেললেন। মান্না দে কাছে আসতেই পড়ে শোনালেন সে লেখা। পরবর্তীতে ‘প্রথম কদমফুল’ ছবিতে সুধীন দাশগুপ্তের সুরে মান্না দে গেয়েছিলেন “আমি শ্রী শ্রী ভজহরি মান্না”। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের এমন বহু ঘটনা কোলকাতার সংগীত জগতে চির ভাস্বর হয়ে আছে।
১৯৩১ সালের ২ মে হাওড়ায় জন্মেছিলেন পুলক বন্দোপাধ্যায়। তাঁর বাবা কান্তিভূষণ বন্দোপাধ্যায় ছিলেন অনেক গুণের অধিকারী। ছবি আঁকতেন, বিভিন্ন ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজাতেন, গান গাইতেন আর কবিতা লিখতেন। তাই খুব ছোটবেলা থেকেই লেখালেখির হাতেখড়ি হয় পুলক বন্দোপাধ্যায়ের। ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়ার সময় বন্ধুদের অনুরোধে একটি ছড়া লিখে পাঠিয়ে দিলেন একটি জনপ্রিয় ম্যাগাজিনে। সেবছরের পূজাবার্ষিকীতে সেই ছড়া ছাপা হলো। সম্মানী হিসেবে পেলেন পাঁচ টাকা। সেই থেকে লেখালেখিতে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস অনুভব করতে লাগলেন। দশম শ্রেণীতে পড়ার সময় ‘অভিমান’ ছবির জন্য প্রথম গান লেখেন। ছবির পরিচালক ‘রামচন্দ্র পাল’ গানের লেখককে দেখে বিশ্বাস করতে চাইলেন না গানগুলো এই অল্প বয়সী ছেলের লেখা। শেষটাতে পরিচালকের সামনে বসে গান লিখে প্রমাণ দিতে হয়েছিল পুলক বাবুকে।
কিন্তু পুলকের জীবনের শেষ বিদায়টি আজো সংগীত ভক্তদেরকে খুব কাঁদায়। ১৯৯৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসের ৭ তারিখের পড়ন্ত বিকেলে লঞ্চ থেকে ঝাঁপ দিয়ে নদীতে পড়ে স্বেচ্ছায় প্রাণ বিসর্জন দিয়েছিলেন পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। মনের মধ্যে কী কষ্ট ছিল তাঁর, কেউ কখনো বুঝতে পারেনি। কাউকে বলেও যাননি পুলক। পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় সংগীত জগতের সবার মনেই দিয়ে গেছেন অবিস্মরণীয় যত গান। দিয়ে গেছেন-ভালোবাসা। বিরহ, অভিমান সব। কিন্তু কোন অভিমানে সবাইকে কাঁদিয়ে এভাবে নিজেই পৃথিবী থেকে ছুটি নিয়ে গেলেন, তা জানা হলো না আজো…।
পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনের গল্প ও তাঁর সংগীত সৃষ্টির অজানা ইতিহাস জানতে এই লিংকে ক্লিক করে বই সংগ্রহ করতে পারেন।

Pingback: পুলক বন্দ্যোপাধ্যায় : জীবন, গান ও শেষ বেদনাহীন স্মৃতি | banibitan.com