পাখিরাও জড়ায় পরকীয়া সম্পর্কে, হয় বিচ্ছেদও

বাণীবিতান ডেস্ক।।

সারা দুনিয়ায় নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ে এবং বিচ্ছেদের ঘটনা খুবই স্বাভাবিক ঘটনা। কিন্তু সেটা যদি হয় পাখির ক্ষেত্রেও? তাহলে তো চোখ শিকেয় উঠবে অবশ্যই। তবে শিকেয় উঠলেও ঘটনা কিন্তু সত্যি। এক শ্রেণির পাখি আছে, যারা বিয়ের কয়েক বছর পরই পরকীয়ায় জড়িয়ে পড়ে। একই সঙ্গে নিজের সঙ্গীকে ছেড়েও চলে যায়।

বিশেষ করে কোকিল জাতে পাখিগুলো কোথাও বাসা বাঁধে না বলে তাদের নির্দিষ্ট কোনো সঙ্গীও থাকে না। শুধু প্রজনন মৌসুমে সঙ্গী নির্বাচন করে। এসব পাখি প্রজননের পর অন্য পাখিদের বাসায় ডিম পাড়ে। তাই প্রজনন হয়ে গেলে সঙ্গীর সঙ্গে থাকার প্রয়োজন মনে করে না।

পরকীয়া করার পাখির এই তালিকায় সবচেয়ে পরিচিত পাখিটির নাম চড়ুই। আমাদের বাসা-বাড়িতে যেসব চড়ুই বাসা বাঁধে, তারা পরকীয়া করতে অভ্যস্ত। এছাড়া আরও অনেক পাখির নাম রয়েছে এ তালিকায়। সেগুলো হলো— সং স্প্যারো, ইউরোপিয়ান স্টারলিং, মালার্ড ডাক, রেড-ব্যাকড ফেয়ারিউরেন।

ব্রিটিশ দৈনিক পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত চীন ও জার্মানির এক যৌথ গবেষণাবিষয়ক প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর এ খবর জানা গেছে। এছাড়া ব্রিটেনের জীববৈচিত্র্যবিষয়ক ‘প্রসেডিংস অব দ্য রয়্যাল সোসাইটি বি জার্নালে’ প্রকাশিত গবেষণাপত্রে গবেষকরা বলেছেন, কয়েক হাজার পাখিকে এখন জীবনসঙ্গী ছাড়াই দেখা যাচ্ছে। বিস্তৃত পাখির প্রজাতিভেদে বিচ্ছেদের নানা কারণ থাকলেও প্রধান দুটি কারণ পাওয়া গেছে বলে জানান গবেষকরা। এর মধ্যে প্রথম কারণটি হলো ‘পুরুষ পাখির বহুগামিতা’। অন্যটি হলো স্ত্রী বা পুরুষ পাখির একে অপরের কাছ থেকে ‘দীর্ঘ দূরত্বে’ যাওয়া। ২৩২টি প্রজাতির পাখির মৃত্যুর তথ্য ও অভিবাসন দূরত্বের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদের হার সম্পর্কিত প্রকাশিত তথ্যের যোগসূত্র খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা।

গবেষকরা আরো দাবি করেছেন, দীর্ঘ সময় আলাদা থাকা ও একাধিক যৌন সম্পর্কের কারণে পাখিদের মধ্যে বিচ্ছেদ হয়। অন্তত এক প্রজনন মৌসুম পর্যন্ত ৯০ শতাংশ প্রজাতির পাখির একক সঙ্গী থাকে। তবে এক সঙ্গীতে অভ্যস্ত কিছু পাখি তাদের আসল সঙ্গী জীবিত থাকা সত্ত্বেও পরবর্তী প্রজনন মৌসুমের জন্য অন্য সঙ্গীর কাছে চলে যায়। পাখিদের এমন আচরণকেই বিচ্ছেদ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সবচেয়ে বেশি বিচ্ছেদ হয়- প্লোভার, সোয়ালো, মার্টিন, ওরিওল ও ব্ল্যাকবার্ড প্রজাতির মধ্যে। এ ধরনের পুরুষ পাখির মধ্যে বহুগামিতাও বেশি। অন্যদিকে পেট্রোল, অ্যালবাট্রস, গিজ ও রাজহাঁসের বিচ্ছেদের হার কম। এসব প্রজাতির পুরুষ পাখি একই সঙ্গীদের সঙ্গে বিশ্বস্ততার সঙ্গে দীর্ঘসময় জীবন কাটিয়ে দেয়।

গবেষকদের দেওয়া তথ্যমতে, পাখিদের মধ্যেও এ ধরনের পরকীয়া সম্পর্কের নেপথ্যের কারণ হচ্ছে হরমোনের ভূমিকা। টেসটোস্টেরন এবং এস্ট্রোজেনের হরমনোর মাত্রা পাখিদের যৌন আকাঙ্ক্ষা যৌন আচরণকে প্রভাবিত করে।

গবেষকদের ভাষায়- ইদানীং দেখা যাচ্ছে প্রথম বংশবৃদ্ধি হওয়ার আগেই এ ধরনের পাখিগুলো অন্য সঙ্গী খুঁজে নিচ্ছে। অথবা অন্য সঙ্গীর সঙ্গে গোপনে চুকিয়ে প্রেম করে বেড়াচ্ছে। আর পাখিদের মধ্যেও মানুষের মতো একটা বিষয় আছে, তা হচ্ছে- সঙ্গীর একজন পরকীয়ায় জড়ালে, অন্য পাখিটি তা কিছুতেই মানতে পারে না। ফলে এক পর্যায়ে গিয়ে সেই সম্পর্ক বিচ্ছেদে রূপ নেয়। আবার কেউ সম্পর্কে এরকম পরকীয়া সম্পর্কে জড়ালে জুটি মিলে হাওয়া হয়ে কোথায় যে যায়, সে খবর ঘরের সঙ্গী কিছুতেই বুঝতে পারে না। পরকীয়া করা সঙ্গী সন্ধ্যায় আর ঘরে ফেরে না। এভাবে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকলে এক পর্যায়ে তাদের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়। কারণলং ডিসট্যান্স রিলেশনশিপ’ পাখিরাও পছন্দ করে না।

আবার এমনও দেখা যাচ্ছে, পাখি দম্পতির একজন অনেক দূরে উড়ে গিয়ে আর ফিরে আসছে না। সেখানেই অন্য সংসার পাতছে। ফলে বিচ্ছেদ হচ্ছে অচিরেই। অথিথি পাখিদের ক্ষেত্রে ঠিক এ কারণে বিচ্ছেদ বেশি হচ্ছে। ‘লং ডিসট্যান্স রিলেশনশিপ’ আজকাল পাখিরাও পছন্দ করছে না।

বিজ্ঞানীরা বলছেন, পাখিদের বিচ্ছেদের বিষয়টি শুনে অনেকের কাছে খুব হাস্যকর মনে হলেও মোটেও তা অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কারণ সিভিলাইজেশনের নামে প্রকৃতির ওপর বিরূপ আচরণের কারণে পাখিদের পারস্পরিক কথোপকথন ও তাদের বংশবিস্তারের প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে।

পাখিদের পরকীয়া সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা প্রমাণ করে যে, প্রকৃতিও বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় ধারায় পরিচালিত হয়। জেনেটিক বৈচিত্র্য, প্রজনন সাফল্য, পুরুষের প্রতিযোগিতা এবং সামাজিক কাঠামো পাখিদের পরকীয়া সম্পর্কের প্রধান কারণ।

পাখি নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে গবেষণা করা ক্যানবেরার অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির পাখি বিশেষজ্ঞ ডক্টর রস ক্রেটার তাঁর গবেষণাগ্রন্থে বলেছেন, পৃথিবীর বহু প্রজাতির পাখি এখন বিলুপ্তির তালিকায়। তিনি গবেষণা করতে গিয়ে দেখেছেন, নিজের প্রজাতির পাখিদের মধ্যে ভাব বিনিময়ের যে মাধ্যম, তাই ভুলে গেছে পাখিরা। নিজেদের মধ্যে কথা বলতে এখন তারা অন্য প্রজাতির গান নকল করছে। ডক্টর রস বলছেন, গোটা বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর পরিবর্তন, পরিবেশের ভয়াবহ বিপর্য সৃষ্টিকারী কল-কারখানার দূষণে পরিবেশ বদলের ভয়ংকর প্রভাবে প্রকৃতিও টলোমল হয়ে গেছে।
এর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ একটি কারণ হচ্ছে- মোবাইল ফোনের টাওয়ারসহ বিভিন্ন নেটওয়ার্কের বিস্তার। এসব কারণে পাখিদের মনেও ব্যাপক প্রভাব পড়েছে। তাদের মনেও প্রেম আর জমছেই না। পাখিরা যে গান শুনে বা বুলি শুনে ছুটে এসে সঙ্গী বেছে নিত, সেই প্রক্রিয়া এখন বাধাগ্রস্ত। ফলে পাখিদের মধ্যেও সেই প্রভাব পড়েছে। আর কিছু নয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top