তিব্বতে বৌদ্ধরা ধর্ম প্রচার করেছিলেন যেভাবে

বাণীবিতান ডেস্ক।।

ভারতীয় উপমহাদেশ সেই আদিকাল থেকেই ভাষা, ধর্ম, বর্ণ ও কাব্যসহ সংস্কৃতিতে পরিপূর্ণ। বলা হয়
এই ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত ভারতবর্ষের বিখ্যাত মহাকাব্য রামায়ণ, মহাভারতের সাথেও। যে গ্রন্থ সনাতন ধর্মাবলম্বীরা প্রাচীন কাল থেকে আজো শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করে আছে।

তবে এশিয়া মহাদেশের অন্যান্য স্থানে বাঙালি প্রাচীন বৌদ্ধরা তাদের ধর্ম প্রচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। পাশাপাশি তিব্বতেও বৌদ্ধধর্ম প্রচারে অবদান ছিল তাদেরই।

প্রাচীন বাঙালি বৌদ্ধদের ইতিহাস

প্রাচীনকালে সবচেয়ে প্রাচীনতম রাজ্যটির নাম হলো বঙ্গ। অন্যান্য প্রাচীন ভারতীয় বাংলা রাজ্যের মধ্যে গঙ্গাঋদ্ধি, পুণ্ড্রবর্ধন, সমতট, হরিকেল এবং গৌড় রাজ্য উল্লেখযোগ্য। বৈদিক যুগের অবসান ঘটার পর বাংলা বেশ কয়েকটি শক্তিশালী সাম্রাজ্যের মধ্যে হরিয়াঙ্ক রাজবংশ, নন্দ সাম্রাজ্য, মৌর্য রাজবংশ, এবং শক্তিশালী গুপ্ত সাম্রাজ্যের নাম ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে

পালবংশের মাধ্যমে বৌদ্ধধর্মের প্রসার
প্রাচীন বাংলার বিখ্যাত পাল সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শাসক গোপাল। প্রাকৃত ভাষায় পাল শব্দের অর্থ হলো ‘রক্ষাকর্তা’। গোপালের উত্তরসূরি, ধর্মপাল এবং দেবপাল, অত্যন্ত সাফল্যের সাথে উত্তরাধিকার বহন করে নিয়ে যান। এই তিনজন ছিলেন বিশিষ্ট প্রাচীন বাঙালি ভারতীয় বৌদ্ধ। তারা সকলেই তাদের শাসনামলে বৌদ্ধদর্শনকে ব্যাপকভাবে প্রচারে মগ্ন ছিলেন। মূলত: পালদের হাত ধরেই ভারতে বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার ও প্রসার ঘটে। তাদের মাধ্যমে নির্মাণ করা হতো বড় বড় বৌদ্ধমঠ। তারা মানুষের মধ্যে আলোচনা করতেন বৌদ্ধ শাস্ত্র সম্পর্কে। বৌদ্ধদের কাছে কেউ ধর্মগ্রন্থ পড়া বা জানার জন্য গেলে তাদেরকে প্রাণ ভরে সহযোগিতা করতেন।

প্রাচীন বাঙালি তিলো পা

৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে তিলো পা নামে ভারতীয় এক বাঙালি জ্ঞানার্জনের উদ্দেশ্য গৃহত্যাগ করেন। ধারণা করা হয়, অধুনা চট্টগ্রামে এক ব্রাহ্মণ বা রাজপরিবারে জন্মেছিলেন তিলো পা। জ্ঞানপিপাসু তিলো পা ভারতজুড়ে ঘুরে ঘুরে পণ্ডিতদের কাছ থেকে শিক্ষালাভ করেন। শেষ পর্যন্ত তিনি নেপালে গিয়ে এক গুরুর কাছ থেকে দীক্ষা নেওয়ার সময় নির্বাণ বা ‘সিদ্ধি’ লাভ করেন। কিছু কিংবদন্তি অনুসারে, তার এই বোধিলাভ ছিল সরাসরি এক দৈব উপহার। তিলো পা ছিলেন একজন পরিশ্রমী বৌদ্ধ সাধক। জ্ঞানের দীর্ঘ অনুসন্ধানের একপর্যায়ে তিনি তিল পিষে জীবিকা নির্বাহ শুরু করেন।

পরে নারো পা নামে এক ব্যক্তি তিলো পা’র শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। নারো পা-ও ছিলেন বাঙালি রাজ পরিবারের সন্তান। তার আসল নাম ছিল সামন্তভদ্র বা অভয়কীর্তি। স্ত্রীর সাথে বিবাহ বিচ্ছেদের পর বৌদ্ধ সন্ন্যাস লাভের উদ্দেশ্যে বাড়ি ছেড়ে চলে যান নারো পা। কিন্তু তার প্রবল আগ্রহ তাকে ধাবিত করে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের পথে। নালন্দায় ভর্তির পর তিনি বিভিন্ন বিষয়ে সেখানে অধ্যয়ন শুরু করেন।

এক সময়ে নারো পা’র পাণ্ডিত্য চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সবাই তাঁর নামে জয়ধ্বনি দিতে থাকেন। কথিত আছে, একজন ডাকিনীর আহ্বানে তিলো পা’কে খুঁজে বের করার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিলেন নারো পা। মূল উদ্দেশ্য ছিল, তিলো পা’র দীক্ষায় জ্ঞানের সর্বোচ্চ চূড়ায় আহরণ করা। ততদিনে মহাসিদ্ধ হিসেবে তিলো পা’র জ্ঞান গরিমার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল চারিদিকে।

যা-ই হোক, অবশেষে তিলো পা’র দর্শন পেলেন নারো পা। প্রথম দেখাতে নারো পা তাকে চিনতে পারেনি। জ্ঞান পরিধি বিস্তৃতির জন্য বারোটি কঠিন এবং বারোটি সহজসাধ্য কাজ দেওয়া হয়েছিল নারো পা’কে। নিজ অধ্যবসায় এবং কঠোর সাধনার গুণে এই অগ্নিপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নারো পা তার গুরুর সমস্ত দীক্ষা আয়ত্তে সক্ষম হন। পরবর্তীকালে, নারো পা তার শিষ্যদের মাঝে এই সমস্ত তত্ত্বজ্ঞান ছড়িয়ে দিয়ে যান। তাদের মধ্যে মার পা নামে একজন ছাত্র ছিলেন, যিনি সেই সমস্ত দিব্যজ্ঞান তিব্বতে নিয়ে এসেছিলেন।

গুরু নারো পা’র একজন শিষ্য হিসাবে মার পা বৌদ্ধধর্মের সমস্ত নীতিসমূহে করেছিলেন সিদ্ধিলাভ, যা তাঁকে মোক্ষ, বিভিন্ন ধরনের বন্ধনমোচন, জ্ঞানার্জন, অপবর্গ, এবং মুক্তিলাভে সহায়তা করেছিল। দীক্ষা সমাপ্তির পর, মার পা’র গুরু তাকে বৌদ্ধ ধর্মের একজন প্রতিনিধি হিসেবে তিব্বতে পাঠান। উদ্দেশ্য, সেখানকার মানুষের মাঝে শান্তি আনয়ন। তিব্বতিরা বর্তমানে নারো পা’কে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৌদ্ধ মহাসিদ্ধ হিসেবে বিবেচনা করে। কিংবদন্তি অনুসারে, বিখ্যাত বৌদ্ধ যোগিনী নিগুমা ছিলেন নারো পা’র বোন। তবে এর পেছনে শক্তপোক্ত কোনো প্রমাণ নেই।

বৌদ্ধ ধর্মের পবিত্রতম গ্রন্থের নাম ত্রিপিটক। এটি মূলত যে ভাষায় লেখা হয়েছিল তার পরে এটি পালি ক্যানন নামেও পরিচিত। এটি পালি ভাষায় লেখা। গ্রন্থটি প্রাচীন ভারতীয় ভাষায় বর্ণিত। মহামতি গৌতম বুদ্ধ নিজে যে ভাষার কথা বলেছিলেন, তার সাথে এই ভাষার অসাধারণ মিল রয়েছে।

বৌদ্ধ ধর্মে মহামতি গৌতম বুদ্ধের চারটি উপদেশ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভাবে পালন করেন ভক্তরা। তা হচ্ছে- জীব হত্যা, চুরি, অবৈধ যৌনাচার, মিথ্যা এবং নেশা থেকে বিরত থাকার প্রতিশ্রুতি। বৌদ্ধ মতবাদের মধ্যে, তারা জ্ঞানার্জনের পথে অগ্রগতির জন্য মন এবং চরিত্রের বিকাশের জন্য বোঝানো হয়েছে। এগুলিকে কখনও কখনও মহাযান ঐতিহ্যে শ্রাবকায়ান উপদেশ হিসাবে উল্লেখ করা হয়, বোধিসত্ত্ব বিধিগুলির সাথে তাদের বৈপরীত্য।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top