যেভাবে সিগারেট ছেড়েছিলেন তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়

বিপ্লব রায়।।

সিগারেট আর লেখক- এ দুইয়ের মধ্যে যেন এক গভীর সম্পর্ক। হয়তো ব্যতিক্রমও আছেন অনেকে। তবে সিগারেট প্রিয় কবি-সাহিত্যিকের সংখ্যাই বেশি। এর মধ্যে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ও একজন। তিনি ছিলেন তুখোড় ধূমপায়ী। চেইন স্মোকার। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় এতই সিগারেট টানতেন যে, তাঁর শরীর থেকেও এক প্রকার ভ্যাপসা গন্ধ আসতো। অথচ তিনিই কিনা নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে ধূমপান ছেড়েছিলেন। পাঠক বলবেন, এটা কোনো লেখার জিনিস হলো? হ্যাঁ, বিষয়টি লেখার জিনিস এজন্যই যে, তারাশঙ্কর নিজের গায়ে ছ্যাঁকা দিয়ে ধূমপান ছেড়েছিলেন। মজার এই বিষয়টি একটু পরে বলছি। তবে আমার এই লেখা যাঁরা নতুন পড়ছেন, তাদের কাছে লেখক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটু পরিচয় আগে দিয়ে নেই।

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন বিংশ শতাব্দীর ভারতীয় বাঙালিদের মধ্যে একজন নামকরা কথাসাহিত্যিক। তিনি ৬৫টি উপন্যাস, ৫৩টি ছোটোগল্প-সংকলন, ১২টি নাটক, ৪টি প্রবন্ধ-সংকলন, ৪টি স্মৃতিকথা, ২টি ভ্রমণকাহিনি, একটি কাব্যগ্রন্থ এবং একটি প্রহসন রচনা করেন। আরোগ্য নিকেতন উপন্যাসের জন্য ১৯৫৫ সালে রবীন্দ্র পুরস্কার ও ১৯৫৬ সালে সাহিত্য অকাদেমি পুরস্কার এবং ১৯৬৭ সালে গণদেবতা উপন্যাসের জন্য জ্ঞানপীঠ পুরস্কারেও ভূষিত হয়েছেন তারাশঙ্কর। এছাড়া ১৯৬২ সালে তিনি পদ্মশ্রী এবং ১৯৬৮ সালে পদ্মভূষণ সম্মান অর্জন করেন। ১৯৭১ সালে তিনি সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন।[

তারাশঙ্করের উপন্যাস ও ছোটোগল্প অবলম্বনে বাংলা ভাষায় একাধিক জনপ্রিয় ও সমালোচকদের দ্বারা প্রশংসিত চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে উপমহাদেশের বিখ্যাত চিত্রপরিচালক সত্যজিৎ রায় পরিচালিত জলসাঘর ও অভিযান এবং অজয় কর পরিচালিত সপ্তপদী, তরুণ মজুমদার পরিচালিত গণদেবতা, তপন সিংহ পরিচালিত হাঁসুলী বাঁকের উপকথা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

এবার আসি আসল গল্পে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তারাশঙ্কর নিজেই বলেছিলেন, ‘আমার জেদ চিরকালই বড্ড বেশি। এই দেখো না জেদের বশে পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছর ধরে সিগারেট খাওয়ার অভ্যেস এক দিনে ছেড়ে দিলুম।’ সুনীল তো তার কথাটা বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না। ‘চেইন স্মোকার’ তারাশঙ্কর হুট করে এক দিনের নোটিশে যে সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিতে পারেন, এ তো একেবারেই অবিশ্বাস্য!

তাই কৌতূহলী হয়ে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় যখন জানতে চাইলেন, ‘এত কঠিন সিদ্ধান্ত নিলেন কীভাবে?’ জবাবে কোনো কথা না বলে তারাশঙ্কর শুধু নিজের বাঁ হাতটা উঁচু করে দেখালেন। তখন তাঁর পুরো হাতজুড়ে দেখা গেল অসংখ্য পোড়া দাগ। দেখে মনে হয় কেউ যেন তারাশঙ্করকে ধরে ছ্যাঁকা দিয়েছে। এসব চিহ্ণ দেখে চমকে উঠলেন সুনীল। বললেন- ‘এ কী দশা হয়েছে তোমার!’

সুনীল চমকে উঠলেও তারাশঙ্কর চমকাননি মোটেও। তাঁর নিরুত্তাপ জবাব, ‘কিছু না। সিগারেট ছাড়ার পর ও জিনিস আবার খেতে লোভ হলেই সিগারেট ধরাতাম। কিন্তু টানতাম না। তবে নিজের হাতে একে একে ছ্যাঁকা দিয়েছি। তাই এখন আর লোভ হয় না।’ বরং সিগারেট দেখলে রীতিমত ভয় হয়।

কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বাস্তবে ছিলেন খুবই দিলখোলা। বড় মনের মানুষ। আড্ডা-আলাপেও ছিলেন দারুণ রসিক। তবে একটা জায়গায় এই লেখক ছিলেন একেবারেই ব্যতিক্রম, তাঁর ছিল সীমাহীন জেদ। জেদের বশেই হাত পুড়িয়ে ধূমপান ছাড়তে পেরেছিলেন তিনি।

তারাশঙ্করের জেদের আরো কিছু নমুনা আছে। যেমন- ছাপাখানায় তারাশঙ্করের একটি উপন্যাস প্রিন্টে উঠেছে। ছয় ফর্মা মানে ৮০ পৃষ্ঠার মতো ছাপাও হয়ে গেছে। এ সময় তারাশঙ্কর খুব তড়িঘড়ি করে প্রেসে গিয়ে বই ছাপা আটকে দিলেন। লেখায় কী যেন একটা পরিবর্তন করতে হবে। ছাপা আটকে গেল। অথচ সেই ভদ্রলোক বাড়িতে ফিরে ওই উপন্যাস আবার লেখা শুরু করলেন। প্রায় ৯০০ পৃষ্ঠা আবার নতুন করে লিখলেন। বোঝেন অবস্থা। ৯০০ পৃষ্ঠা কি এক দুদিনে লেখা যায়?

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের এ ধরনের জেদি কাণ্ডের উদাহরণ অসংখ্য। কল্লোল পত্রিকার মাধ্যমে তাঁর সাহিত্যযাত্রার সূচনা। পত্রিকাটি নিয়মিত তাঁর লেখা ছাপত। কিন্তু একদিন কল্লোল পত্রিকা অফিসে গিয়ে তেমন আপ্যায়ন আর অভ্যর্থনা পাননি বলে তাঁকে আর কোনো দিন ওই অফিসে নেওয়া যায়নি। নিজের জেদ আর আত্মমর্যাদার প্রশ্নে এমনই কঠোর ছিলেন ১৯৭১ বইয়ের লেখক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়।

প্রিয় পাঠক, তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই পড়তে চাইলে এই লিংকে ক্লিক করে সংগ্রহ করতে পারেন।

সূত্র: বিনোদ ঘোষালের বই বাংলা সাহিত্যের দশ দিক  

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top